কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার কোকোপিট পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন করে আধুনিক কৃষির প্রসারে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছেন তরুণ কৃষক হোসাইন রাব্বি। এই পদ্ধতিতে উন্নত জাতের, রোগমুক্ত চারা উৎপাদন করে নিজেদের ভাগ্য বদলাতে পারছেন কৃষকরা।
প্রবাস ফেরত উদ্যোক্তা হোসাইন রাব্বি সম্প্রতি বুড়িচং উপজেলার সমেসপুর গ্রামে কোকোপিট পদ্ধতিতে শীতকালীন সবজির চারা উৎপাদন করে আলোচনায় এসেছেন। দীর্ঘদিন ধরে চারা উৎপাদনের জন্য পরিচিত এই গ্রামে তার উদ্যোগ নতুন মাত্রা যোগ করেছে। উন্নত মানের চারা ও ভালো ফলনের আশায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কৃষকরা এখন সমেসপুরে ছুটে আসছেন।
কোকোপিট তৈরি:
কোকোপিট তৈরি হয় নারিকেলের ছোবড়া থেকে। ছোবড়া ছোট ছোট করে কেটে গুঁড়ো করে ফাইবার আলাদা করে এই কোকোপিট প্রস্তুত করা হয়। এটি হালকা, পানি ধারণক্ষমতা বেশি এবং মাটির বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এতে নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়াম থাকায় গাছের বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
সমেসপুর গ্রাম প্রায় ৭০ বছর ধরে চারা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। প্রতিবছর শীত মৌসুমে ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাউ, টমেটো, বেগুন ও মরিচসহ বিভিন্ন শীতকালীন সবজির চারায় গ্রামটি সবুজ হয়ে ওঠে। এতদিন কৃষকরা সনাতন পদ্ধতিতে মাটিতে চারা উৎপাদন করলেও চলতি মৌসুমে কোকোপিট পদ্ধতি সেই ধারায় নতুন সম্ভাবনা যোগ করেছে।
কোকোপিটে উৎপাদিত চারার মান:
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোকোপিটে উৎপাদিত চারাগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি সুস্থ ও রোগমুক্ত থাকে। সাধারণ মাটিতে উৎপাদিত চারায় পোকামাকড় ও রোগের আক্রমণে অনেক সময় চারা নষ্ট হয়ে যায়, ফলে লোকসানের মুখে পড়েন কৃষকরা। কিন্তু কোকোপিট পদ্ধতিতে প্রায় শতভাগ চারা বেঁচে থাকে এবং জমিতে রোপণের পর গাছের বৃদ্ধি ও ফলন দুটোই ভালো হয়। এজন্য এই চারার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।
হোসাইন রাব্বি জানান, ইউটিউব ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে ধারণা নিয়ে এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শে তিনি প্রথমবারের মতো কোকোপিট পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন শুরু করেন। তিনি বলেন, কোকোপিট মূলত নারিকেলের ছোবড়া ও ভার্মি কম্পোস্টের সংমিশ্রণ। এতে অতিরিক্ত আর্দ্রতা জমে না এবং পোকামাকড়ের আক্রমণও কম হয়, ফলে উৎপাদন ঝুঁকি অনেকটাই হ্রাস পায়।
চাহিদা কেমন ?
কোকোপিটে উৎপাদিত চারাগুলোর মান ভাল হওয়ায় চারা সংগ্রহ করতে আশপাশের উপজেলা ছাড়াও দূরদূরান্ত থেকে আসেন কৃষকরা। কেউ চারা কিনছেন, কেউ আবার এই নতুন পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। অনেকেই ভবিষ্যতে নিজ নিজ জমিতে এই পদ্ধতি প্রয়োগের পরিকল্পনা করছেন।
কোকোপিট পদ্ধতির সম্প্রসারণে মাঠপর্যায়ে কাজ করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। একটি চলমান প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা ও নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
বুড়িচং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আফরিনা আক্তার বলেন, কোকোপিট পদ্ধতিতে উৎপাদিত চারার মান ভালো হয় এবং রোগবালাই কম থাকে। এই পদ্ধতি সম্প্রসারিত হলে কৃষকরা আর্থিকভাবে আরও লাভবান হবেন।
তিনি আরও জানান, সমেসপুর ও আশপাশের গ্রামের শত শত কৃষক ইতোমধ্যে চারা উৎপাদনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়েছেন। কোকোপিট পদ্ধতি এই সফলতাকে আরও টেকসই করবে এবং আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এমইউএম/










