আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের একটি রূপরেখা রেখে যেতে চায় অন্তর্বর্তী সরকার। সাধারণত জুনের প্রথম সপ্তাহে পরবর্তী অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করা হয়ে থাকে। ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই বৈঠকে পরবর্তী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৮.৫ ট্রিলিয়ন টাকার (৮ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা) একটি বাজেট রূপরেখা অনুমোদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হতে পারে আগামী ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে নতুন অর্থবছরের পূর্ণাঙ্গ বাজেট প্রণয়ন বা ঘোষণা করা সম্ভব হবে না। এ দায়িত্ব নিতে হবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকারকে।
এ লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে আজ সোমবার বাজেট-সংক্রান্ত একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক ডাকা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবন যমুনায় বেলা ১১টায় এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট এবং আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারক এবং এনবিআরের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান। এ ছাড়া অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও বৈঠকে থাকতে বলা হয়েছে।
বৈঠকে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট এবং আগামী অর্থবছরের সম্ভাব্য বাজেটের আকার নিয়ে একটি উপস্থাপনা উপস্থাপন করবেন অর্থ বিভাগের সচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার। পাশাপাশি দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির একটি ধারণাও তুলে ধরা হবে। এ জন্য বাজেট-সংক্রান্ত একটি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলাদা আরেকটি উপস্থাপনা দেওয়া হবে।
অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের আকার সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। শুরুতে এই বাজেট কাটছাঁট করে সাত লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনার চিন্তা ছিল। তবে সুদ পরিশোধ ও ভর্তুকি খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যাংক একীভূতকরণে মূলধন সহায়তা, সরকারি চাকরিজীবীদের বিভিন্ন ভাতা বাড়ানোর পাশাপাশি নানা ক্ষেত্রে সরকারের পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এখন আর বড় ধরনের কাটছাঁটের পরিকল্পনা নেই। এমনকি বাজেট অপরিবর্তিতও থাকতে পারে। শেষ পর্যন্ত দুই হাজার কোটি টাকা কমানো হলে সংশোধিত বাজেটের আকার দাঁড়াতে পারে সাত লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা।
এ সংশােধিত বাজেট আগামী জানুয়ারির মধ্যে চূড়ান্ত করে প্রকাশ করার পরিকল্পনা রয়েছে। সাধারণত পরবর্তী বাজেট ঘােষণার সময় সংশােধিত বাজেট প্রকাশ করা হয়। তবে চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার কমানো হতে পারে ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা। এতে এডিপির আকার দুই লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা থেকে কমে দুই লাখ ৫ হাজার কোটি টাকায় নামতে পারে। একই সঙ্গে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সূত্র জানায়, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য তিন ধরনের বাজেট রূপরেখার খসড়া তৈরি করেছে অর্থ বিভাগ। এর মধ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় ব্যয় সাশ্রয়ী কঠোর পদক্ষেপ নিলে বাজেটের আকার হতে পারে সোয়া আট লাখ কোটি টাকা। আবার রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিলে বাজেটের আকার আট লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকায় নেওয়ার সুযোগও রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে সাড়ে আট লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি একটি মাঝামাঝি ধরনের রূপরেখাও প্রস্তুত করা হয়েছে। আগামী বাজেটের এডিপির সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে আড়াই লাখ কোটি টাকা। তবে মোট বাজেটের আকার পরিবর্তন হলে এডিপিও সে হারে সমন্বয় হবে।
সরকার চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৬ শতাংশ প্রাক্কলন করে। সংশোধিত বাজেটে এটি বাড়িয়ে ৭ শতাংশ করা হচ্ছে। অন্যদিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন সাড়ে ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। দেশে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ না হওয়ায় জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন কমানো হচ্ছে। একই সঙ্গে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতি ও ৬ শতাংশ জিডিপির প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা সমকালকে জানান, আগামী অর্থবছরের শুরুতে সরকারি কর্মচারীদের জন্য একটি আর্থিক সুবিধা ঘোষণার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ হারে মহার্ঘ ভাতা দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হতে পারে। আজকের বৈঠকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তবে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের দায়িত্ব নতুন সরকারের ওপর ছেড়ে দিতে চায় অন্তর্বর্তী সরকার।
মামুন










