কোনো পক্ষ থেকে খবরদারি বা জবরদস্তি বরদাশত করা হবে না

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সাম্প্রতিক এক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেছেন যে, তেহরান কোনোভাবেই ‘অবমাননাকর ও একতরফা শর্তে’ আলোচনায় বসবে না। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার আড়ালে ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে দুর্বল করার পরিকল্পনা চালাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই ঘোষণা নতুন রাজনৈতিক তাৎপর্য তৈরি করেছে।

প্রেসিডেন্ট বলেন, শত্রুরা ইরানের প্রতিটি ক্ষমতার স্তম্ভ কেড়ে নিতে চায়, যাতে ইরানকে দুর্বল ও বিভক্ত রাষ্ট্রে পরিণত করা যায় এবং ইসরায়েলি শাসনের সামনে দেশটিকে অসহায় করা সম্ভব হয়। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র শান্তির নামে আলোচনায় বসতে চাইলেও প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে ইরানকে সামরিকভাবে অকার্যকর করে দেওয়া।

তিনি আরও বলেন, ইরান শান্তি চায়। কিন্তু কোনো ধরনের খবরদারি, জবরদস্তি বা চাপ প্রয়োগ কৌশল তারা সহ্য করবে না। দেশটি স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা প্রশ্নে কখনোই মাথা নত করবে না বলে উল্লেখ করেন পেজেশকিয়ান।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার ইতিহাস টানাপোড়েনপূর্ণ। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে শুরু করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, সিরিয়া ও ইরাক ইস্যু এবং ইসরায়েল-ইরান ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব পর্যন্ত বিভিন্ন কারণে দুই দেশের সম্পর্ক ক্রমেই অবিশ্বাসের পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হলেও বর্তমানে তা স্থগিত হয়ে আছে।

পেজেশকিয়ান অভিযোগ করেন, আলোচনার ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্র নতুন শর্ত জুড়ে দিচ্ছে। এসব শর্তের মধ্যে থাকতে পারে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন কমানো, আঞ্চলিক মিলিশিয়াদের সহায়তা হ্রাস, ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলোতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ বাড়ানো এবং পরমাণু কর্মসূচি সীমিতকরণ। ইরানের মতামত, এসব শর্ত দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার ভিত্তির ওপর আঘাত।

প্রেসিডেন্ট জানান, ইরান এর আগে আন্তরিকভাবে আলোচনায় যুক্ত ছিল। কিন্তু জুন মাসে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি জটিল হতে থাকে এবং আলোচনার গতি থেমে যায়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত—গাজায় ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ, সিরিয়ায় ইসরায়েলি হামলা, লোহিত সাগরে হুথিদের অভিযান এবং মার্কিন বাহিনীর পাল্টা প্রতিক্রিয়া—এই পরিস্থিতি দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র চাপ প্রয়োগের নীতি বাস্তবায়ন করলে আলোচনার পথ আরও সংকুচিত হবে। এর ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে পারে এবং ইরানের সামরিক নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়া আরও কঠোর হতে পারে।

ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অর্থনৈতিক সংকট ও মূল্যস্ফীতির মতো চাপে ভুগতে থাকা জনগোষ্ঠীর মধ্যে এমন বক্তব্য সহানুভূতি সৃষ্টি করে এবং সামরিক বাহিনীর প্রভাবশালী অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়।

তবে পেজেশকিয়ানের মন্তব্যে আলোচনার দরজা একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে—এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায় না। বরং তিনি বলেছেন, সম্মানজনক শর্তে আলোচনায় তেহরান প্রস্তুত। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র যদি একতরফা শর্ত প্রত্যাহার করে, তবে সংলাপ পুনরায় শুরু হতে পারে।

আন্তর্জাতিক মহলে এই অবস্থানের প্রতিক্রিয়া মিশ্র হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় ব্যর্থ হলে নিষেধাজ্ঞা আরও বাড়াতে পারে। রাশিয়া ও চীন সম্ভবত ইরানের সার্বভৌম সিদ্ধান্তকে সমর্থন করবে। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন উভয় পক্ষকে আলোচনায় ফেরানোর জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, আলোচনার স্থবিরতা অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে পারে। ইরানের সামরিক সক্ষমতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের চাপ প্রয়োগ কৌশল সংঘাতের বিস্তার ঘটাতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে উভয়পক্ষের ভুল সিদ্ধান্ত বা সামান্য উত্তেজনাও বড় ধরনের যুদ্ধের দিকে পরিবেশকে ঠেলে দিতে পারে।

সুতরাং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার ভবিষ্যত নির্ভর করছে কূটনৈতিক উদ্যোগ, রাজনৈতিক সমঝোতা ও আলোচনার ন্যায্য শর্তের ওপর। মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা রক্ষায় আন্তর্জাতিক ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা জরুরি। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের বক্তব্য স্পষ্ট করে দেয়—সম্মানজনক, সমমর্যাদাপূর্ণ আলোচনার বাইরে কোনো পথ তেহরানের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।