কে হচ্ছেন দেশের ২৬তম প্রধান বিচারপতি?

বাংলাদেশের বিচার বিভাগে আসছে বড় পরিবর্তন। সংবিধান অনুযায়ী সাতষট্টি বছর বয়স পূর্ণ হওয়ায় দেশের ২৫তম প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ শিগগিরই অবসরে যাচ্ছেন। আগামী ২৭ ডিসেম্বর তার কর্মজীবনের শেষ দিন। তবে সর্বোচ্চ আদালতে ১৮ ডিসেম্বর থেকে অবকাশকালীন ছুটি শুরু হওয়ায় ওই দিনই কার্যত শেষ হবে তার বিচারিক কর্মযজ্ঞ।

তার বিদায়ের প্রাক্কালে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন— কে হচ্ছেন দেশের পরবর্তী তথা ২৬তম প্রধান বিচারপতি? বিচার বিভাগ, আইন অঙ্গন এবং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে এই প্রশ্ন ঘিরে চলছে তীব্র জল্পনা-কল্পনা।

সংবিধানের অবস্থান: রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা প্রাধান্য পায়

বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৫ (১) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা আছে—
“প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োজিত হইবেন।”

একই অনুচ্ছেদের পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে অন্যান্য বিচারপতিদের নিয়োগ দেবেন। অর্থাৎ প্রধান বিচারপতির নিয়োগ সম্পূর্ণরূপে রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার।

তবে বাস্তবিক রীতি ও সাংবিধানিক চর্চায় সাধারণত আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতিদের মধ্য থেকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু এর ব্যতিক্রমও বাংলাদেশে ঘটেছে। বর্তমান প্রধান বিচারপতি ড. রেফাত আহমেদ ছিলেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি; সেখান থেকেই তাকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

এই ব্যতিক্রমের কারণে এবার নতুন নিয়োগ নিয়েও নানা মহলে চলছে আলোচনা— রীতি অনুসরণ করা হবে নাকি রাষ্ট্রপতি ভিন্ন কাউকে নিয়োগ দেবেন?

নিয়োগের ক্ষেত্রে বয়স একটি বড় বিষয়

বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা নিয়ে সংবিধানের ৯৬(১) অনুচ্ছেদে বলা আছে—

“অন্যান্য বিধানাবলী সাপেক্ষে কোনো বিচারক সাতষট্টি বছর বয়স পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত স্বীয় পদে বহাল থাকিবেন।”

এ বয়সসীমাকে ঘিরেও বিচারপতিদের মেয়াদ, জ্যেষ্ঠতা এবং সম্ভাব্য নিয়োগ নিয়ে আলোচনার জন্ম হয়েছে। কারণ কেউ কম মেয়াদ রেখে দায়িত্ব নিলে পরবর্তীতে প্রধান বিচারপতি পরিবর্তন দ্রুত ঘটতে পারে, যা বিচার বিভাগের স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলতে পারে।

কমিশনের সুপারিশ: জ্যেষ্ঠতম বিচারপতিই প্রধান বিচারপতি

বাংলাদেশে বিচার বিভাগ ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে গঠিত বিভিন্ন কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়— রাষ্ট্রপতি যেন আপিল বিভাগের কর্মরত জ্যেষ্ঠতম বিচারপতিকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেন।

সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়—

“আপিল বিভাগের বিচারকদের মধ্য থেকে মেয়াদের ভিত্তিতে জ্যেষ্ঠতম বিচারককে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ প্রদানের সুপারিশ করছে।”

অন্যদিকে বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়—

“রাষ্ট্রপতি আপিল বিভাগের কর্মে প্রবীণতম বিচারপতিকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করিবেন।”

ফলে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেওয়ার জোরাল যুক্তি রয়েছে।

বর্তমান আপিল বিভাগে কারা দায়িত্বে?

বর্তমানে সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগে দায়িত্বে রয়েছেন:

  • বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম

  • বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী

  • বিচারপতি মো. রেজাউল হক

  • বিচারপতি এস এম এমদাদুল হক

  • বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান

  • বিচারপতি ফারাহ মাহবুব

সংবাদ মাধ্যম ও আইন অঙ্গনের সূত্রমতে, দায়িত্বকাল, জ্যেষ্ঠতা, পেশাগত অভিজ্ঞতা ও সাংবিধানিক চর্চার আলোকে তালিকার সবার আগে রয়েছে বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলামের নাম।

সম্ভাব্য প্রার্থীদের পেশাগত যাত্রা এবং অবসরের তারিখ

১️⃣ বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম

এলএলবি ও এলএলএম অর্জনের পর ১৯৮৩ সালে জেলা আদালতে আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ২০০৩ সালে হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারক হন এবং ২০০৫ সালে স্থায়ী বিচারপতি হন। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে আপিল বিভাগে যোগ দেন।
তিনি অবসরে যাবেন ২০২৬ সালের ১৪ জুলাই

২️⃣ বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী

১৯৮৫ ও ১৯৮৭ সালে নিম্ন আদালত ও সুপ্রিম কোর্টে তালিকাভুক্ত হন। ২০০৩ সালে অতিরিক্ত বিচারক ও ২০০৫ সালে স্থায়ী বিচারপতি হন।
তিনি অবসরে যাবেন ২০২৮ সালের ১৭ মে

৩️⃣ বিচারপতি মো. রেজাউল হক

১৯৯০ সালে সুপ্রিম কোর্টে তালিকাভুক্ত হন। ২০০৪ সালে অতিরিক্ত বিচারক এবং দুই বছর পর স্থায়ী বিচারক হন।
তার অবসরের তারিখ ২০২৭ সালের ২৩ এপ্রিল

৪️⃣ বিচারপতি এস এম এমদাদুল হক

১৯৯২ সালে সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। ২০০৪ সালে অতিরিক্ত বিচারপতি এবং দুই বছর পর স্থায়ী বিচারপতি হন।
তিনি অবসরে যাবেন ২০৩০ সালের ৬ নভেম্বর

৫️⃣ বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান

১৯৮৫ সালে হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। পরে ২০০৩ সালে অতিরিক্ত ও দুই বছর পর স্থায়ী বিচারপতি হন।
তিনি অবসরে যাবেন ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি

৬️⃣ বিচারপতি ফারাহ মাহবুব

১৯৯৪ সালে হাইকোর্টে তালিকাভুক্ত হন। ২০০৪ সালে অতিরিক্ত বিচারপতি এবং দুই বছর পর স্থায়ী বিচারপতি হন।
তিনি অবসরে যাবেন ২০৩৩ সালের ২৬ মে

জ্যেষ্ঠতা, মেয়াদ ও অভিজ্ঞতা বিবেচনায় একাধিক নাম আলোচনায় থাকলেও শীর্ষ তিন বিচারপতিই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন— আশফাকুল ইসলাম, জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও রেজাউল হক।

রাজনৈতিক ও নীতিগত বিবেচনা

প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতির নিয়োগের বিষয় হওয়ায় রাজনৈতিক সামঞ্জস্যও এখানে ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিশ্লেষকদের মত। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে দেশে বহু বিতর্ক রয়েছে। ফলে নিয়োগটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তাও বয়ে আনতে পারে।

আইনজীবী মহলে আলোচনা— নিয়োগ প্রক্রিয়া যেন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকে এবং জ্যেষ্ঠতা রীতিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। অনেকেই মনে করেন, হঠাৎ করে হাইকোর্ট বিভাগ থেকে কাউকে নিয়োগ দিলে আবারো বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে।

বিচার বিভাগের স্থিতিশীলতার প্রশ্ন

প্রধান বিচারপতির মেয়াদ সাধারণত সংক্ষিপ্ত হয়, কারণ অনেক বিচারপতিই অবসরের কাছাকাছি এসে এ দায়িত্ব পান। ফলে দীর্ঘ মেয়াদের বিচারপতি দায়িত্ব পেলে ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। এ ক্ষেত্রে জুবায়ের রহমান চৌধুরী, এস এম এমদাদুল হক অথবা ফারাহ মাহবুবও আলোচনার অংশ হয়।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারপতির দীর্ঘমেয়াদ বিচার বিভাগের নীতি, সংস্কার ও প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে সহায়ক হতে পারে।

তারপরও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রপতির হাতে

সরকারি ঘোষণা ছাড়া কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না কে হচ্ছেন পরবর্তী প্রধান বিচারপতি। রাষ্ট্রপতি যেকোনো সময় নিয়োগের গেজেট প্রকাশ করতে পারেন।

বিচার বিভাগ, আইন অঙ্গন ও প্রশাসনিক পর্যবেক্ষকরা তাই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করছেন।

২৫তম প্রধান বিচারপতির অবসরের প্রাক্কালে এখন সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন— দেশের বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ পদে কে বসছেন?

সংবিধানের বিধান, বিচার বিভাগের রীতি, অভিজ্ঞতা, বয়স ও মেয়াদ ইত্যাদি বিবেচনায় বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তিনজন:

  • বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম

  • বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী

  • বিচারপতি মো. রেজাউল হক

এদের মধ্যে রাষ্ট্রপতি কাকে বেছে নেন, তা কয়েকদিনের মধ্যেই জানা যাবে। ফলে বিচারাঙ্গনসহ দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিমণ্ডল নতুন একটি অপেক্ষার প্রহর গুনছে।