তাকওয়া হলো আল্লাহকে ভয় করে তাঁর সকল আদেশ মেনে চলা এবং গুনাহ ও হারাম কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখা, যা মুমিনের হৃদয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ, যা মানুষকে আল্লাহর নৈকট্য ও পুরস্কার লাভে সাহায্য করে এবং কুরআনের ভাষায়, এটি মুত্তাকীদের জন্য হেদায়াত। এটি শুধু বাহ্যিক নয়, বরং অন্তরের একটি অবস্থা যা মানুষকে পাপ থেকে বাঁচায় এবং জীবনে সঠিক পথ চলতে সহায়তা করে, যেমন হযরত ইউসুফ (আঃ) ও হযরত উমর (রাঃ)-এর জীবনে এর উদাহরণ দেখা যায়।
তাকওয়া মুমিনের একটি অপরিহার্য গুণ। কুরআন মাজীদে তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য অনেক সুসংবাদ বর্ণিত হয়েছে। আল্লামা ফাইরোযাবাদী রাহ. তাঁর কিতাব بصائر ذوي التمييز -এ কুরআনে কারীমে বর্ণিত সুসংবাদগুলো উল্লেখ করেছেন। কুরআনে কারীমের প্রায় ২৭ স্থানে মুত্তাকীদের জন্য সুসংবাদ উল্লেখিত হয়েছে।
কুরআন মাজিদে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁদের সাথে থাকেন, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে। –সূরা নাহল (১৬) : ১২৮
নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি হচ্ছে মুত্তাকীগণ। –সূরা হুজুরত (৪৯) : ১৩
নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকীদেরকে ভালোবাসেন। –সূরা তাওবা (৯) : ৪
যাঁরা তাকওয়া অবলম্বন করে তারা কিয়ামতের দিন তাদের (কাফেরদের) উপরে থাকবে। –সূরা বাকারা (২) : ২১২
যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং সৎ থাকে, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা কখনো দুঃখিত হবে না। –সূরা আরাফ (৮) : ৩৫
জান্নাতে বিভিন্ন নিআমতের এবং আল্লাহর দীদার লাভের সুসংবাদ :
اِنَّ الْمُتَّقِیْنَ فِیْ جَنّٰتٍ وَّ نَهَرٍ، فِیْ مَقْعَدِ صِدْقٍ عِنْدَ مَلِیْكٍ مُّقْتَدِرٍ.
যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে তারা থাকবে উদ্যানরাজি ও নহরে। সত্যিকারের মর্যাদাপূর্ণ আসনে, সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মহা সম্রাটের সান্নিধ্যে। –সূরা ক্বমার (৫৪) : ৫৪-৫৫
এখানে কিছু সুসংবাদ ও পুরস্কারের কথা উল্লেখ করা হল। যবানে নবুওতেও তাকওয়া সম্পর্কে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। যেমন, হযরত নুমান ইবনে বাশীর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি–
إِنّ الْحَلَالَ بَيِّنٌ، وَإِنّ الْحَرَامَ بَيِّنٌ، وَبَيْنَهُمَا مُشْتَبِهَاتٌ لَا يَعْلَمُهُنّ كَثِيرٌ مِنَ النّاسِ، فَمَنِ اتّقَى الشّبُهَاتِ اسْتَبْرَأَ لِدِينِهِ، وَعِرْضِهِ، وَمَنْ وَقَعَ فِي الشّبُهَاتِ وَقَعَ فِي الْحَرَامِ.
হালাল সুস্পষ্ট, হারামও সুস্পষ্টই। এ দুয়ের মাঝে যা কিছু আছে তা হল, ‘মুশতাবিহাত’ বা সন্দেহপূর্ণ (অর্থাৎ হালালও হতে পারে, হারামও হতে পারে)। অনেক মানুষ এ সম্বন্ধে সঠিক জ্ঞান রাখে না। সুতরাং যে শুবুহাত (সন্দেহপূর্ণ বিষয়) এড়িয়ে চলবে, সে তার দ্বীন ও সম্মান নিয়ে নিরাপদে থাকবে। আর যে ওই শুবুহাত তথা সন্দেহপূর্ণ বিষয়ে জড়িয়ে পড়বে, সে হারামে নিপতিত হবে। –সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৫৯৯
আবু বকর রা.-এর একজন গোলাম ছিল। সে তার উপার্জনের একটি অংশ আবু বকর রা.-কে দিত। আবু বকর রা. তা খেতেন। একদিন সে কিছু (খাবার) নিয়ে এল। আবু বকর রা. তা থেকে কিছু খেলেন। তখন সে বলল, আপনার কি জানা আছে, এই খাবার আমি কীভাবে লাভ করেছি? আবু বকর রা. জানতে চাইলে সে বলল, জাহেলী যুগে আমি এক ব্যক্তির জন্য গণকের কাজ করেছিলাম। (অর্থাৎ গণকের মত ভবিষ্যতের বিষয় বলেছিলাম।) আমি তো গণকের কাজ পারি না; (তার কাছে গণক সেজেছিলাম) তাকে ধোঁকা দিয়েছিলাম। আজ তার সাথে দেখা হলে সে তার বিনিময়ে এ খাবার দিয়েছে। একথা শোনার সাথে সাথে আবু বকর রা. তার গলার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দিলেন এবং যা খেয়েছিলেন বমি করে সব বের করে দিলেন। –সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৮৪২; শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস ৫৩৮৬
ইমাম নববী রাহ. তাঁর ‘তাহযীবুল আসমা’ কিতাবে একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। শাফেয়ী মাযহাবের বড় শায়েখ, ‘আলমুহাযযাব ফিল মাযহাব’ কিতাবের লেখক ইমাম আবু ইসহাক আশশীরাযী রাহ. ছিলেন খুবই দরিদ্র। কিন্তু সততা এবং তাকওয়ায় পাহাড়-কঠিন। একদিন তিনি মসজিদে প্রবেশ করলেন কিছু খেতে। বের হওয়ার সময় ভুলে এক দীনার ফেলে আসলেন। কিছুদূর গিয়ে তার মনে পড়ল, তিনি মসজিদে এক দীনার ফেলে এসেছেন। তখন তিনি আবার মসজিদে গেলেন এবং তার দীনারটি পেয়েও গেলেন। কিন্তু তখনই তাঁর হালত পাল্টে গেল। তিনি মনে মনে ভাবলেন, কতজনের দীনারই তো এখানে পড়ে থাকতে পারে। এটা যদি আমার না হয়!
এটা তারই ফেলে যাওয়া দীনার– এটাই স্বাভাবিক; কিন্তু যদি না হয়! হারামের এ সামান্য সন্দেহে তা আর নিলেন না। কারণ, হারাম পেটে যাবে, এটা তো মানা যায় না। তাই দীনারটি তিনি স্পর্শ করলেন না। ফিরে গেলেন। সুবহানাল্লাহ! কত কঠিন সতর্কতা। অথচ তাঁর অবস্থা এমন ছিল যে, একটি দীনার ছিল তাঁর জন্য অনেক বড় কিছু। (দ্র্র. তাহযীবুল আসমা ওয়াল লুগাত ২/১৭৩)
আমরা কিছু বিধান মেনে চলার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন করতে পারি-
- আল্লাহর ভয় ও স্মরণ: সর্বদা আল্লাহকে স্মরণ করা এবং তার আদেশ-নিষেধ মনে রাখা।
- কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ: নির্ভরযোগ্য ধর্মগ্রন্থ পাঠ ও সে অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা।
- আল্লাহওয়ালাদের সঙ্গ: তাকওয়াবান ও সৎ ব্যক্তিদের সান্নিধ্য গ্রহণ করা।
- নিয়ত বিশুদ্ধ রাখা: সকল ভালো কাজের পেছনে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়ত রাখা।
- জিহ্বার সংযম: অপ্রয়োজনীয় কথা ও গীবত থেকে বিরত থাকা
চারিদিকে এখন হারামের ছড়াছড়ি। এমনকি আমাদের অনেক খাবারেও এখন হারাম মিশ্রিত হওয়ার খবর শোনা যায়। সুতরাং আমরা সতর্ক ও সচেতন হব। যাচাই-বাছাই করে খাওয়ার অভ্যাস করব। আল্লাহকে ভয় করব।
আল্লাহ আমাদেরকে তাকওয়াওয়ালা জীবন যাপনের তাওফীক দান করুন– আমীন।
মামুন










