জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে যখন নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে, ঠিক তখন ঢাকাসহ ছয়টি সিটি করপোরেশনে দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। নির্বাচন কমিশন প্রস্তুতির কথা বললেও কবে ভোট হবে, সে প্রশ্নে স্পষ্ট সময়সীমা এখনও মেলেনি।
প্রশাসক নিয়োগ ও নতুন বাস্তবতা
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সিলেট এবং খুলনা সিটি করপোরেশনে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন আবদুস সালাম (ঢাকা দক্ষিণ), শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন (ঢাকা উত্তর), নজরুল ইসলাম মঞ্জু (খুলনা), আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী (সিলেট), সাখাওয়াত হোসেন খান (নারায়ণগঞ্জ) ও শওকত হোসেন সরকার (গাজীপুর)।
সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন আইন অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ করপোরেশন গঠিত না হওয়া পর্যন্ত তারা পূর্ণকালীন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসকদের কেউ কেউ বলেছেন, জনগণের আস্থা অর্জন করেই তারা নির্বাচনের দিকে যেতে চান।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তখন যুক্তি ছিল, জনপ্রতিনিধিরা অনুপস্থিত থাকায় নাগরিক সেবা ব্যাহত হচ্ছে।
মেয়াদোত্তীর্ণ তিন সিটি, আইনি বাধ্যবাধকতা
আইন অনুযায়ী, সিটি করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ঢাকা দক্ষিণের মেয়াদ ২০২৫ সালের ১ জুন, ঢাকা উত্তরের ২ জুন এবং চট্টগ্রাম সিটির ২২ ফেব্রুয়ারি পূর্ণ হয়েছে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় পৃথক চিঠিতে নির্বাচন কমিশনকে ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিতে বলেছে।
তবে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আইনি ও কারিগরি কিছু বিষয় নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। প্রতীক, আইন সংশোধন এবং বিভিন্ন কমিশনের সুপারিশ বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের মতে, সিটি করপোরেশন শুধু মেয়র নয়; কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলরদের নিয়েই পূর্ণাঙ্গ কাঠামো। সাবেক সিনিয়র সচিব আবু আলম শহীদ খান বলেছেন, কাউন্সিলর পদ শূন্য থাকলে নাগরিক সেবা কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা কঠিন।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, শুধুমাত্র প্রশাসক দিয়ে কতদিন নগর পরিচালনা সম্ভব। নাগরিকদের দৈনন্দিন সেবা, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং স্থানীয় জবাবদিহির প্রশ্নে নির্বাচিত প্রতিনিধির বিকল্প নেই বলে মত বিশ্লেষকদের।
রাজনৈতিক বিতর্ক ও অবস্থান
ছয় সিটিতে দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগের প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির নেতারা বলছেন, এটি নির্বাচন বিলম্বিত করার কৌশল হতে পারে।
একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তাদের দাবি, আইনি সময়সীমা অতিক্রান্ত হয়েছে; দ্রুত নির্বাচন না হলে নাগরিক ভোগান্তি বাড়বে এবং রাজনৈতিক সংকট তীব্র হতে পারে।
অন্যদিকে সরকারপক্ষ বলছে, মেয়াদ অনুযায়ী ধাপে ধাপে নির্বাচন হবে এবং রাজনৈতিক প্রশাসকরা জনগণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থেকে সেবা নিশ্চিত করতে পারবেন।
অনিশ্চয়তা কাটবে কীভাবে?
বিশ্লেষকদের মতে, মূল প্রশ্নটি সময়সীমা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সংবিধান অনুযায়ী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার কথা। নির্বাচন বিলম্বিত হলে একদিকে নাগরিক সেবা প্রশ্নের মুখে পড়বে, অন্যদিকে রাজনৈতিক উত্তাপও বাড়তে পারে।
এ মুহূর্তে সবার দৃষ্টি নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের দিকে। তারা কবে তফসিল ঘোষণা করবে, সেটিই নির্ধারণ করবে ছয় সিটি করপোরেশনের অনিশ্চয়তা কত দ্রুত কাটবে।
–এজাজ আহমেদ










