‘আমরা সুরক্ষিত নই’: পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো নিয়ে হেবরনের মেয়র

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণের সর্বশেষ পদক্ষেপকে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে আলোচনার ‘চূড়ান্ত সমাপ্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন স্থানীয় হেবরন শহরের মেয়র।

হেবরনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র আসমা আল-শারাবাতি বিবিসিকে জানিয়েছেন, ইসরায়েলি নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার মন্ত্রীরা যে নতুন আইনি পরিবর্তন ঘোষণা করেছে তার ফলে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এমনকি তাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকার নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়নমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকেও বঞ্চিত হবে।

গত রোববার ইসরায়েলি নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা পশ্চিম তীরের ক্ষমতার প্রতিষ্ঠিত বিভাজনে বড় ধরনের পরিবর্তনের অনুমোদন দিয়েছে। তিন দশক আগে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত ঐতিহাসিক ‘অসলো চুক্তির’ মাধ্যমে ক্ষমতার এই ভারসাম্য নির্ধারিত হয়েছিল, যে চুক্তিতে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি নেতারা স্বাক্ষর করেছিলেন। নতুন এই নিয়মে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে ইসরায়েল শুধুমাত্র সামরিক দখলদারিত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে ফিলিস্তিনিদের দ্বারা পরিচালিত এলাকাগুলোতেও পৌরসেবা প্রদানের নিয়ন্ত্রণ নেবে।

এর পাশাপাশি পুরো পশ্চিম তীরের পানি, পরিবেশ ও প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ রক্ষার অজুহাতে তথাকথিত ‘ঐতিহ্যবাহী স্থান’এর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষকে। হেবরনের ইব্রাহিমি মসজিদের ভেতরে অবস্থিত পবিত্র ‘কেভ অব দ্য প্যাট্রিয়ার্কস’-এর পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষও এখন থেকে ইসরায়েল এককভাবে পরিচালনা করবে। আল-শারাবাতি বলেন, “এখন তারা চাইলেই যেকোনো ভবনকে প্রাচীন প্রত্নসম্পদ হিসেবে ঘোষণা করে দখল করতে পারবে, যেখানে নগর পরিকল্পনা বা উন্নয়নের বিষয়ে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অংশ নেওয়ার কোনো অধিকার থাকবে না।” বিবিসিকে তিনি জানান, ইসরায়েলের পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি কোনো আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি পাননি, বিস্তারিত যা জেনেছেন সেগুলো ইসরায়েলি খবরগুলো থেকে পাওয়া।

অ্যানেক্সেশন বা ভূখণ্ড দখলের নতুন আইন

হেবরনের ফিলিস্তিনি অধিকারকর্মী ইসা আমরো জানান, এই পরিবর্তনগুলো আগের চেয়ে আলাদা। তিনি বলেন, “এতদিন তারা কোনো আইনি ভিত্তি ছাড়াই অনেক সম্প্রসারণ চালাচ্ছিল। এখন তারা আইন করেই এটি করছে। এটি ফিলিস্তিনিদের বাদ দিয়েই ভূখণ্ডকে ইসরায়েলের অংশ করে নেওয়ার একটি প্রক্রিয়া।” নতুন পরিকল্পনায় ইসরায়েল এখন থেকে হেবরনের ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সরাসরি পৌরসেবা দেবে এবং পুরো পশ্চিম তীরে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ইসরায়েলি নাগরিকদের জমি কেনার পথ উন্মুক্ত করবে। জর্ডান ও ফিলিস্তিনি আইনে ফিলিস্তিনিদের জন্য অ-ফিলিস্তিনিদের কাছে পশ্চিম তীরের জমি বিক্রি নিষিদ্ধ হলেও ইসরায়েল এখন তাদের নাগরিকদের সেখানে সরাসরি জমি কেনার অনুমতি দিচ্ছে।

ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন ‘কবর’ দেওয়া

ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এই পদক্ষেপের লক্ষ্য স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমরা ইসরায়েলের সব অংশে আমাদের শিকড় আরও গভীরে নিয়ে যাচ্ছি এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ধারণাকে কবর দিচ্ছি।” স্মোট্রিচের দলের আরেক আইনপ্রণেতা জভি সুক্কত জানান, তিনি পুরো পশ্চিম তীরে পূর্ণ ইসরায়েলি সার্বভৌমত্ব আশা করেন। এই পরিস্থিতিকে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি মার্কিন সরকারের কাছে এর ‘কঠোর প্রতিক্রিয়া’ দাবি করে বলেন, ইসরায়েলের এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাতে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করবে।

আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও ট্রাম্পের পরিকল্পনা

যুক্তরাজ্যের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক মন্ত্রী হামিশ ফ্যালকনার এই সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “ইসরায়েলের প্রায় সব বন্ধু রাষ্ট্রই বলছে যে এটি একটি ভয়াবহ, ভয়াবহ ভুল। আমরা আশা করি ইসরায়েল এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে।” আন্তর্জাতিক মহলের মনোযোগ এখন গাজার দিকে থাকলেও পশ্চিম তীরের এই পরিবর্তনগুলো সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের গাজা ও মধ্যপ্রাচ্য শান্তি পরিকল্পনা অনেকাংশেই আরব দেশগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের এই নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন ধূলিসাৎ করার পদক্ষেপ ট্রাম্পের সেই লক্ষ্যকে বড় ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।

-বেলাল