ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আসা বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকরা নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে ‘সন্তোষ’ প্রকাশ করেছেন। তারা বলেছেন, এটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য যে প্রস্তুতি ও পরিবেশ দরকার তার সবটুকুই ছিল। তবে, নির্বাচনকে আরও গ্রহণযোগ্য করতে শেখ হাসিনার দলকে নির্বাচনের সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল, যাতে জনগণের হাতে সুযোগ থাকতো প্রত্যাখ্যান করার।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনে এসেছিলেন মালয়েশিয়ার নির্বাচন কমিশনের চেয়াম্যান রামলান হারুন। তিনি পর্যবেক্ষণ শেষে সাড়ে ১১টার দিকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। কয়েকটি কেন্দ্র পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, ‘আমরা ভোটারদের মধ্যে যথেষ্ট উদ্দীপনা দেখছি। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ বিদ্যমান রয়েছে। সাধারণ ভোটারদের উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিতে দেখা গেছে।
এটিই বাংলাদেশে তার প্রথম আসা উল্লেখ করে বলেন, ‘এখনো নির্বাচনে কোথাও তিনি অপ্রীতিকর পরিস্থিতি দেখেননি। এটি একটি ফ্রি, ফেয়ার ও ক্রেডিবল ইলেকশন বলা চলে। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার নির্বাচন ব্যবস্থার তুলনা করতে বললে তিনি বলেন, দুটি দেশ আলাদা, এর শাসনব্যবস্থা ও নির্বাচনি ব্যবস্থাও আলাদা। নির্বাচনে ৫০ শতাংশ ভোট কাস্ট হলেই আমরা খুশি।
সরকারি নিমন্ত্রণে দিল্লির সিনিয়র সাংবাদিক ও প্রেস ক্লাব অব ইন্ডিয়ার সাবেক কার্যনির্বাহী সদস্য সত্তরোর্ধ্ব আশিস গুপ্তা এসেছেন। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অবস্থান করছেন। সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। তার সঙ্গে মোহাম্মদপুরে দেখা হলে তিনি বলেন, ‘সব কেন্দ্রেই উপচেপড়া ভিড় ছিল। বিশেষ করে মহিলা ভোটকেন্দ্রগুলোতে বোরকা পড়া মহিলাদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।’
তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাইকপাড়া আদর্শ মডেল স্কুলে বিএনপির প্রার্থী সানজিদা ইসলাম তুলির সমর্থকদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করেছেন। তিনি সেখানকার ভোটকেন্দ্রে নারী-পুরুষদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা জানিয়েছেন, এবার তারা ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে ভোট দিতে এসেছেন। বিগত নির্বাচনগুলোতে ভোট দিতে আসেননি কারণ তারা আগে থেকেই জানতেন কে জয়ী হবে। এবার তার ব্যতিক্রম।
আশিস গুপ্তা আরও বলেন, ‘আমি মিরপুরের আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র পরিদর্শনকালে উত্তেজনার মুখে পড়ি। এ সময়ে সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ‘কুইক অ্যাকশনে’ এগিয়ে আসার কারণে কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি।
তবে, তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘মিডিয়া ও নিরাপত্তাবাহিনীর কারণে কেন্দ্রে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এলেও তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়নি। তবে আমাদের সঙ্গে থাকা ইরানের সংসদ সদস্য কথা বলতে পেরেছেন শফিকুর রহমানের সঙ্গে।’
আশীষ গুপ্তা যে ডেলিগেশনে ছিলেন তাতে ইরানের একজন সংসদ সদস্য, নাইজেরিয়া, উজবেকিস্তান, ভারত ও শ্রীলঙ্কার পর্যবেক্ষক ছিলেন। তারা মিরপুরের তিনটি কেন্দ্রে গিয়েছেন।
১৩ বছর এনডিটিভিতে কাজ করেছেন সৌরভ শুক্লা। ভারতের বেশ পরিচিত এই সাংবাদিক চাকরি ছেড়ে ‘রেড মাইক’ নামে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কো-ফাউন্ডিং এডিটর হিসেবে কাজ করেছেন। বাংলাদেশের নির্বাচন কাভারের জন্য গত চারদিন ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করে অনেকগুলো রিপোর্ট করেছেন। যার প্রচুর ভিউ হয়েছে। তিনি গুলশান, ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। ভোটারদের যে মনোভাব তাতে বিএনপি সরকার গঠন করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে বলে মনে করেন।
এই নির্বাচনে ভোটারদের উৎসাহ ও উদ্দীপনা তাকে মুগ্ধ করেছে। তিনি অনেক মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। সবার মাঝে ব্যাপক-উৎসাহ ও উদ্দীপনা লক্ষ্য করেছেন। তিনি মনে করেন, ‘এই নির্বাচনে শেখ হাসিনার দলকে সুযোগ দিলে নির্বাচন আরও গ্রহণযোগ্য হতো। আওয়ামী লীগ ভোটের মাঠে থাকলে তাদের বর্জন করার একটা সুযোগ পেতো সাধারণ মানুষ।’
তবে, জামায়াতে ইসলামীর যে উত্থান ঘটেছে তা অবিশ্বাস্য। এভাবে সমর্থক বাড়লে আগামীতে তারা ক্ষমতায় যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
ভারতের আরেক সাংবাদিক স্মিতা শর্মা ৫ আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশে এসেছিলেন তখনো ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িটি ভাঙা হয়নি। তবে, সেই সময় সেই বাড়ি নিয়ে একটি রিপোর্ট আলোড়ন তুলেছিল। তিনি পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই নির্বাচন নিয়ে এ দেশে মানুষের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখতে পেয়েছেন। তিনি জানান, মানুষ যেভাবে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিচ্ছেন তাতে আওয়ামী লীগকে অংশগ্রহণের সুযোগ না দিলেও এই নির্বাচনকে ‘ক্রেডিবল ইলেকশন’ না বলার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশে জামায়াতের উত্থানকে তিনি অনেকটা ‘অ্যালার্মিং’ মনে করেন। আর এক বছর আগে মানুষ যেমন প্রাণ খুলে কথা বলতো এখন এদেশের মানুষ তেমন ‘কথা বলতে চায় চায় না’ বলেও মত তার।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে ভোট পরিদর্শনের পর নির্বাচনের ভোটাভুটি নিয়ে প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের (ইইউইওএম) প্রধান ইভার্স ইজাবস বলেছেন, আমরা একটি অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন প্রত্যাশা করছি। সারা দেশে মোতায়েন করা পর্যবেক্ষকদের কাছ থেকে অনলাইনে প্রতিবেদন ও তথ্য পাচ্ছি।
তিনি বলেন, ‘আমরা দুপুর পর্যন্ত ভোটারদের মধ্যে যথেষ্ট উদ্দীপনা দেখছি। আমরা একটি অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন প্রত্যাশা করছি। সারা দেশে মোতায়েন করা পর্যবেক্ষকদের কাছ থেকে অনলাইনে প্রতিবেদন ও তথ্য পাচ্ছি।’
ইইউইওএম সারা দেশে ২০০ জনের বেশি পর্যবেক্ষক মোতায়েন করেছে। ইভার্স ইজাবস বলেন, ‘আমরা পুরোপুরি নিরপেক্ষভাবে কাজ করছি। আমরা কোনো রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছি না। আমরা শুধু নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছি এবং ১৪ ফেব্রুয়ারি এই নির্বাচন কীভাবে পরিচালিত হয়েছে, তা নিয়ে আমাদের প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করব।’
গত বুধবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচন এবং গণভোট সামনে রেখে অন্তত ৩৯৪ আন্তর্জাতিক নির্বাচনী পর্যবেক্ষক ও ১৯৭ বিদেশি সাংবাদিক বাংলাদেশ পৌঁছেছেন।
প্রেস উইং আরও জানায়, পর্যবেক্ষকের মধ্যে ৮০ জন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি। দ্বিপক্ষীয় দেশগুলোর মধ্যে স্বতন্ত্র ইউরোপীয় পর্যবেক্ষকও রয়েছেন। সেখান থেকে এসেছেন ২৪০ জন। এ ছাড়া বিভিন্ন বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৫১ ব্যক্তি নিজস্ব উদ্যোগে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেন।
-ইমরান/মামুন










