বর্তমানে বিটকয়েন একটি কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আজ (৬ ফেব্রুয়ারি) এর তথ্য অনুযায়ী, বিটকয়েনের দাম গত ১৫ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। গত অক্টোবর ২০২৫-এ ১,২২,২০০ ডলারের রেকর্ড উচ্চতা থেকে এটি বর্তমানে প্রায় ৪৭-৫০% কমেছে
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ও প্রকাশ্য সমর্থন থাকা সত্ত্বেও বিটকয়েনের দাম কমছে। দাম এমন পর্যায়ে নেমেছে, যা গত ১৫ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন।
বর্তমানে একটি বিটকয়েনের দাম ৬৬ হাজার মার্কিন ডলার, যা ২০২৪ সালের অক্টোবরের পর সর্বনিম্ন। চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বিটকয়েনের দাম কমেছে প্রায় ২৪ শতাংশ। তার আগে কয়েক মাস বিটকয়েনের দামে বড় ধরনের ঊর্ধ্বগতি দেখা গিয়েছিল। যার ফলে গত অক্টোবরে দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ ১ লাখ ২২ হাজার ২০০ ডলারে পৌঁছায়।
গত বৃহস্পতিবারের সর্বশেষ দরপতনের পর গত এক বছরে বিটকয়েনের দাম কমেছে প্রায় ৩২ শতাংশ। দাম এখন ধীরে ধীরে ২০২৪ সালের শুরু ও ২০২১ সালের দামের কাছাকাছি পর্যায়ে নেমে যাচ্ছে। বিটকয়েন হলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে পরিচিত ক্রিপ্টোকারেন্সি। এটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল অর্থ, যা কোনো দেশের কেন্দ্রীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়।
ট্রাম্পের সরাসরি সম্পৃক্ততা, ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রতি ট্রাম্পের জোরালো সমর্থন ও এই খাতে নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার প্রতিশ্রুতির কারণে বিনিয়োগকারীরা উৎসাহিত হয়েছিলেন। সে জন্যই বিটকয়েকনের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ২০২৫ সালে জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরেন। তাঁর প্রথম দিকে একটি নির্বাহী আদেশ দেওয়া হয়েছিল। সেটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের ‘ক্রিপ্টো রাজধানী’ হিসেবে গড়ে তোলা।
শুধু তাই নয়, দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরেই ট্রাম্প নিজের নামে একটি ব্যক্তিগত ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্র্যান্ড চালু করেন। এটির বেশির ভাগ মুনাফা যায় তাঁর নিজস্ব কোম্পানিগুলোর ঝুলিতে। পাশাপাশি তিনি ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিন্যান্সিয়াল’–এর সঙ্গেও যুক্ত থাকেন, যা অন্যান্য ক্রিপ্টো সম্পদে বিনিয়োগের একটি মাধ্যম। এটি ট্রাম্প পরিবারের মালিকানাধীন।
ট্রাম্প ক্রিপ্টোকারেন্সিতে ফেডারেল সমর্থন জোরদারে একটি আইনে স্বাক্ষর করেছেন। ক্রিপ্টো নিয়ন্ত্রণ বাস্তবায়নে কাজ করা বিচার বিভাগের (ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস) একটি বিশেষ দল ভেঙে দিয়েছেন তিনি। এমনকি সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) ক্রিপ্টো-সংক্রান্ত অনেক তদন্ত ও আইনগত পদক্ষেপ প্রত্যাহার করেছে।
গত নভেম্বরে সিনেট জুডিশিয়ারি কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্যরা ট্রাম্পের ‘প্রো-ক্রিপ্টো এজেন্ডা’র সমালোচনাও করেন। তাঁরা জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ট্রাম্পের ক্রিপ্টো সম্পদের মূল্য দাঁড়িয়েছে ১১ বিলিয়ন ডলারের বেশি। ক্রিপ্টো লেনদেন থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ব্যক্তিগতভাবে আয় করেছেন প্রায় ৮০ কোটি ডলার।
বিটকয়েনের দাম সাধারণত খুবই অস্থির। তবে ডয়চে ব্যাংকের বিশ্লেষকেরা বুধবার এক প্রতিবেদনে বলেন, সাম্প্রতিক দরপতনের পেছনে মূল কারণ হলো ট্রাম্পের ফেডারেল রিজার্ভের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে কেভিন ওয়ারশকে মনোনয়ন দেওয়া। অনেকের ধারণা, তিনি তুলনামূলকভাবে ‘হকিশ’ নীতি অনুসরণ করবেন—অর্থাৎ সুদের হার বেশি রাখবেন। আর সাধারণত শিথিল মুদ্রানীতি ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো সম্পদে বিনিয়োগকে সহায়তা করে।
ডয়চে ব্যাংক জানায়, গত চার মাস ধরেই বিটকয়েনের দাম নিম্নমুখী। সামগ্রিকভাবে ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব বাড়ছে। তাদের ভাষায়, ধারাবাহিক এই বিক্রি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ঐতিহ্যবাহী বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ হারাচ্ছেন। সার্বিকভাবে ক্রিপ্টো নিয়ে হতাশা বাড়ছে।
অবশ্য ডয়চে ব্যাংক মনে করে না যে ক্রিপ্টোকারেন্সি পুরোপুরি হারিয়ে যাবে। তবে তারা এটাও মনে করে না যে বিটকয়েন আবার ট্রাম্প-ঘেঁষা উচ্চ দামে ফিরে যাবে। ব্যাংকটি বলেছে, ডিজিটাল এই টোকেনটি এখন ‘পুরোপুরি জল্পনাভিত্তিক সম্পদ’ থেকে সরে এসে একটি বাস্তবসম্মত পর্যায়ে যাচ্ছে। যেখানে তাকে নিজের নির্দিষ্ট ভূমিকা খুঁজে নিতে হবে।
আব্রা ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের প্রধান নির্বাহী উইলিয়াম বারহেডট মনে করেন ক্রিপ্টোকারেন্সি ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে। তিনি আশা করেন, দাম আবার ঘুরে দাঁড়াবে।
উইলিয়াম বারহেডট আরও বলেন, ‘বিটকয়েনের দামে বড় ধরনের ওঠানামা এই প্রথম নয়। আমি বলব না যে এটা অবশ্যই ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবে না, সেটাও আমি বুঝতে পারছি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটা না হওয়ার একমাত্র কারণ হতে পারে, যদি আমরা কোনো বড় ধরনের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ি।’
বিটকয়েন ছাড়াও জনপ্রিয় অন্যান্য ক্রিপ্টোকারেন্সির মধ্যে রয়েছে ইথেরিয়াম ও সোলানা। চলতি বছর এগুলোর দাম কমেছে প্রায় ৩৭ শতাংশ।
হাজার হাজার ক্রিপ্টোকারেন্সির পারফরম্যান্স ট্র্যাক করা প্রতিষ্ঠান কয়েনগেকোর তথ্য অনুযায়ী, শুধু গত এক মাসেই বাজার থেকে উধাও হয়েছে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্য। আর গত অক্টোবরে বাজার চূড়ায় পৌঁছানোর পর থেকে মোট ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান স্টিফেল তাদের বিনিয়োগকারীদের কাছে পাঠানো এক নোটে বলেছে, বিটকয়েনের দাম আরও নেমে ৩৮ হাজার ডলার পর্যন্ত যেতে পারে। তারা বলেছে, ক্রিপ্টোকারেন্সির দাম এখন ক্রমেই মার্কিন ডলারের গতিবিধির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত হয়ে পড়ছে। এখানে উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে মার্কিন ডলারের মূল্য নেমে গিয়েছিল গত চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে।
-মামুন









