ভারতে সাবেক সেনাপ্রধানের অপ্রকাশিত বই ঘিরে হঠাৎ তীব্র বিতর্ক

ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল এম এম নারাভানের অপ্রকাশিত স্মৃতিকথার অংশবিশেষ নিয়ে দেশটিতে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। মূলত ভারত–চীন সীমান্তে ২০২০ সালের সামরিক উত্তেজনা সংশ্লিষ্ট বিষয়টি কেন্দ্র করে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

এ বিষয়ে ভারতীয় পার্লামেন্টে বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সংসদের কার্যক্রম একাধিকবার স্থগিত করতেও বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক সেনাপ্রধানের অপ্রকাশিত স্মৃতিকথা থেকে উদ্ধৃতি দেওয়ার চেষ্টা করে ভারতের সংসদে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন দেশটির বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। ওই স্মৃতিকথায় ২০২০ সালে চীনের সঙ্গে সামরিক সংঘাতের সময় ভারতের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

এই অভিযোগগুলো রয়েছে ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল এম এম নারাভানের অপ্রকাশিত বই ‘ফোর স্টারস অব ডেস্টিনি’-তে। ২০২৪ সাল থেকে সরকারি অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা এই বইটি এখনও প্রকাশিত হয়নি। ২০২০ সালে ভারত–চীন সীমান্তে সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনা ও অন্তত চারজন চীনা সেনা নিহত হন।

স্মৃতিকথার এসব অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংসদে তীব্র রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়। সোমবার সংসদের নিম্নকক্ষে লোকসভায় বিতর্ক চলাকালে বইটির অংশ উদ্ধৃত করার চেষ্টা করলে রাহুল গান্ধীকে বারবার বাধা দেওয়া হয়। পরে রাহুল গান্ধী বলেন, স্মৃতিকথায় দাবি করা হয়েছে— লাদাখে ভারতীয় অবস্থানের দিকে চীনা ট্যাংক এগিয়ে এলে সেনাপ্রধান নারাভানেকে বলা হয়েছিল, তিনি যেটা উপযুক্ত মনে করেন, সেটাই যেন করেন।

২০২০ সালের গ্রীষ্মে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় বিতর্কিত হিমালয় সীমান্তে ভারত ও চীনের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এটি ছিল ১৯৭৫ সালের পর দুই দেশের প্রথম প্রাণঘাতী সামরিক সংঘাত। দীর্ঘ সামরিক ও কূটনৈতিক আলোচনার পর ২০২৪ সালে দুই দেশ উত্তেজনা প্রশমনে সীমান্তের সংশ্লিষ্ট এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহারে সম্মত হয়।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি অভিযোগ করেছে, অপ্রকাশিত বই থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে রাহুল গান্ধী সংসদের নিয়ম ভেঙেছেন এবং ভারতীয় সেনাদের অপমান করেছেন। এ বিষয়ে এখনও প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য করেননি সাবেক সেনাপ্রধান নারাভানে।

গত সপ্তাহান্তে দ্য ক্যারাভান ম্যাগাজিনে অপ্রকাশিত স্মৃতিকথা থেকে নেয়া বলে দাবি করা কিছু অংশ প্রকাশের পর থেকেই বইটি ভারতে আলোচনায় রয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, তারা মূল পাণ্ডুলিপি দেখেনি এবং প্রকাশিত অংশগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। এ বিষয়ে নারাভানে ও প্রকাশক পেঙ্গুইন র‌্যান্ডম হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।

বিবিসি বলছে, গত সোমবার সংসদের নিম্নকক্ষে আলোচনার সময় রাহুল গান্ধী ওই ম্যাগাজিনের ফটোকপি থেকে উদ্ধৃতি পড়তে শুরু করেন। তিনি বলেন, “এটি সেই সময়ের কথা, যখন চারটি চীনা ট্যাংক ভারতীয় ভূখণ্ডে ঢুকছিল।” এরপরই তাকে থামিয়ে দেওয়া হয়।

ভারতের সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বলেন, কংগ্রেস নেতাদের জানানো হয়েছিল যে রাহুল গান্ধী তার বক্তব্য চালিয়ে যেতে পারেন। তবে তিনি বলেন, সাবেক সেনাপ্রধান যা বলেননি, যা সত্য নয় এবং যা সংসদের নিয়মে অনুমোদিত নয়— সেগুলো জোর করে সংসদে তোলা যাবে না।

চীন ইস্যুতে মোদি সরকারকে আক্রমণ করে রাহুল গান্ধী এটিই প্রথম প্রচেষ্টা নয়। তিনি আগেও একাধিকবার অভিযোগ করেছেন, ২০২০ সালের সংঘাতের সময় মোদি সরকার ভারতের ভূখণ্ড চীনের হাতে ছেড়ে দিয়েছে। সরকার এসব অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করে বলেছে, চীনের কাছে ভারত কোনও জমি হারায়নি।

সোমবার সংসদে নারাভানের স্মৃতিকথা নিয়ে রাহুল গান্ধীর বক্তব্যে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহসহ বিজেপির সংসদ সদস্যরা তীব্র আপত্তি জানান। তাদের অভিযোগ, অপ্রকাশিত বই থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি সংসদকে বিভ্রান্ত করছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, “রাহুল গান্ধী যে বইয়ের কথা বলছেন, সেটি সংসদের সামনে উপস্থাপন করা উচিত। কারণ বইটি এখনও প্রকাশিত হয়নি।”

রাহুল গান্ধী বলেন, তার সূত্র নির্ভরযোগ্য এবং তিনি উদ্ধৃতি দেওয়ার অধিকার রাখেন। সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডার জেরে সোমবার সংসদের কার্যক্রম ওই দিনের জন্য মুলতবি করা হয়। এরপর মঙ্গলবার আবারও বিষয়টি তুলতে গেলে তাকে বাধা দেওয়া হয়, এতে নতুন করে প্রতিবাদ শুরু করেন বিরোধীরা। পরে বিশৃঙ্খলার অভিযোগে কংগ্রেসের আটজন সংসদ সদস্যকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়।

এরপর বুধবার সংসদের বাইরে সাংবাদিকদের সামনে অপ্রকাশিত বইটির একটি কপি দেখান রাহুল গান্ধী। তিনি বলেন, বইটির অস্তিত্ব নেই বলে প্রতিরক্ষামন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন তা সঠিক নয়। তিনি বই থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, চীনা সেনারা ভারতীয় ভূখণ্ডে ঢুকলেও শীর্ষ নেতৃত্বের অনুমতি ছাড়া গুলি না চালানোর নির্দেশ ছিল।

রাহুল গান্ধীর দাবি, সাবেক সেনাপ্রধান বারবার রাজনাথ সিংকে ফোন করলে প্রধানমন্ত্রী মোদির পক্ষ থেকে এমন বার্তা দেওয়া হয়, যাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব কার্যত নারাভানের ওপরই ছেড়ে দেওয়া হয়। রাহুল গান্ধী ওই বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, “আমি নিজেকে ভীষণ একা মনে করছিলাম। পুরো শাসনব্যবস্থাই বিষয়টি আমার ওপর ছেড়ে দিয়েছিল।” তার মতে, এটি প্রমাণ করে যে লাদাখ সংকটে প্রধানমন্ত্রী মোদি দায়িত্ব এড়িয়ে গেছেন।

নারাভানে কে? বইটি কী নিয়ে লিখেছেন তিনি

এম এম নারাভানে ২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ভারতের সেনাপ্রধান ছিলেন। তার স্মৃতিকথায় ব্যক্তিগত জীবন ও সামরিক কর্মজীবনের নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে বলে জানা গেছে। ২০২৪ সালে বইটি প্রকাশের কথা থাকলেও সামরিক সংঘাতসংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য থাকার কারণে তা বিলম্বিত হয়।

প্রকাশক আনুষ্ঠানিকভাবে বিলম্বের কারণ জানায়নি। তবে গত বছরের এপ্রিল মাসে নারাভানে একটি হিন্দি ইউটিউব চ্যানেলে বলেন, প্রয়োজনীয় অনুমোদনের জন্য পেঙ্গুইন র‌্যান্ডম হাউস ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আলোচনা চলছে। তিনি বলেন, “আমার কাজ ছিল বই লেখা ও প্রকাশকের হাতে দেওয়া। এখন সেটি প্রকাশ করা তাদের দায়িত্ব।”

ভারতের বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, অবসরপ্রাপ্ত গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে— এমন কোনও তথ্য অনুমোদন ছাড়া প্রকাশ করতে পারেন না।

সম্প্রতি ইন্ডিয়া টুডে চ্যানেলে সাবেক সেনা কর্মকর্তা কেজেএস ধীল্লন বলেন, কোনও সেনা কর্মকর্তা যদি অভিযানের বিস্তারিত তথ্যসহ বই প্রকাশ করতে চান, তবে তা আগে সেনা সদরদফতরের অনুমোদনের জন্য জমা দিতে হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর তিনটি সিদ্ধান্ত হতে পারে— সংবেদনশীল তথ্য না থাকলে অনুমোদন, আপত্তি থাকলে লেখকের সঙ্গে আলোচনা, অথবা জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেললে সম্পূর্ণ বাতিল।

নারাভানে অবশ্য এই ধরনের বই লেখা প্রথম অবসরপ্রাপ্ত সেনাপ্রধান নন। ২০০৬ সালে সাবেক সেনাপ্রধান ভিপি মালিক ১৯৯৯ সালের ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধ নিয়ে বই প্রকাশ করেছিলেন। কেজেএস ধীল্লনও কাশ্মীরে দায়িত্ব পালন ও ২০২৫ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক উত্তেজনা নিয়ে বই লিখেছেন।

-সাইমুন