২০২২ সালের সেই ডিসেম্বর। ফুটবল বিশ্বকে বিস্মিত করে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো যখন সৌদি আরবের আল-নাসর ক্লাবে যোগ দিলেন, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন মরুর তপ্ত বালুচরে জন্ম নিতে যাচ্ছে ক্রীড়াজগতের নতুন এক রাজকীয় রূপকথা। রিয়াদের আলোঝলমলে স্টেডিয়ামে সিআর-সেভেনের সেই রাজকীয় অভিষেক শুধু একটি ক্লাব বদলের ঘটনা ছিল না; ছিল এশীয় ফুটবলকে বিশ্বমঞ্চে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার এক উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের সূচনা।
কিন্তু তিন বছরের মাথায় এসে প্রশ্নটা জোরালো হয়ে উঠেছে সেই জৌলুস কি তবে ম্লান হতে শুরু করেছে? সোমবার আল-রিয়াদের বিপক্ষে ম্যাচে রোনালদোর অনুপস্থিতি এবং নেপথ্যের নানা গুঞ্জন ফুটবলপ্রেমীদের মনে বড় এক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে রিয়াদে কি সত্যিই ফুরিয়ে আসছে রোনালদো অধ্যায়?
ব্যক্তিগত অর্জনের হিসাবে অবশ্য রোনালদো এখনো অপ্রতিরোধ্য। ক্যারিয়ারে এক হাজার গোলের ঐতিহাসিক মাইলফলক ছোঁয়ার নেশা এখনো তাড়িয়ে বেড়ায় ৪০ বছর বয়সী এই মহাতারকাকে। আল-নাসরের হয়ে গত শুক্রবার আল-খোলুদের বিপক্ষে গোল করে তার মোট ক্যারিয়ার গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৬১-এ। অর্থাৎ ‘হাজারি ক্লাবে’ পৌঁছাতে প্রয়োজন আর মাত্র ৩৯টি গোল।
তবে ফুটবল কেবল ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানের খেলা নয়। গোলের পর গোল করলেও আল-নাসরের জার্সিতে বড় কোনো দলগত ট্রফির স্বাদ এখনো পাননি রোনালদো। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আল-হিলাল কিংবা আল-ইত্তিহাদ যখন একের পর এক শিরোপা উল্লাসে মেতে উঠছে, তখন রোনালদোর ট্রফি ক্যাবিনেট যেন মরুর খাঁখাঁ রোদে খাঁখাঁ করছে।
বিবিসির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এই অনিশ্চয়তার পেছনে রয়েছে পুঞ্জীভূত হতাশা ও ক্ষোভ। সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের (পিআইএফ) ক্লাব পরিচালনা পদ্ধতি এবং আল-নাসরের তুলনামূলক মন্থর বিনিয়োগ নাকি হতাশ করেছে পর্তুগিজ মহাতারকাকে। বিশেষ করে করিম বেনজেমার আল-হিলালে যোগ দেওয়া এবং প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবগুলোর শক্তিবৃদ্ধি রোনালদোর হতাশাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জয়ী মানসিকতার এই ফুটবলার কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না যে তার ক্লাব বিনিয়োগের দৌড়ে পিছিয়ে পড়ছে। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ছাড়ার সময়ও রোনালদো বুঝিয়ে দিয়েছিলেন প্রতিষ্ঠানের নিয়মের চেয়ে তার আত্মসম্মানই তার কাছে বড়। রিয়াদের বর্তমান পরিস্থিতিতেও যেন সেই পুরনো নাটকেরই নতুন মঞ্চায়ন দেখা যাচ্ছে।
২০২৭ সাল পর্যন্ত আল-নাসরের সঙ্গে চুক্তি থাকলেও সাম্প্রতিক নীরবতা, ম্যাচ থেকে দূরে থাকা এবং অস্বস্তিকর গুঞ্জনগুলো কি তবে বড় কোনো বিচ্ছেদের ইঙ্গিত দিচ্ছে? নাকি অধরা শিরোপার টানে শেষ পর্যন্ত রিয়াদেই লড়াই চালিয়ে যাবেন রোনালদো?
উত্তর এখনো অজানা। তবে এটুকু নিশ্চিত মরুর আকাশে জমে উঠেছে অনিশ্চয়তার ঘন মেঘ। সৌদি অধ্যায়ের শেষ অধ্যায় কীভাবে লেখা হবে, সেই অপেক্ষায় এখন পুরো ফুটবল বিশ্ব।
-এমইউএম










