যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদানের তাওইলায় মানবিক সংকট চরমে

ছবিঃ সংগৃহীত

১৮ বছর বয়সী মন্তাহা ওমর মুস্তাফা ছিলেন তাদেরই একজন, যারা উত্তর দারফুরের এল-ফাশের শহরটি আধাসামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) দখলের আগে কোনোমতে ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন। তবে সে পথ ছিল বিপজ্জনক ও ব্যয়বহুল। নিরাপদে বের হতে টাকা দিতে হয়েছে, এরপর কয়েক দিন হেঁটে যেতে হয়েছে-প্রায় কোনো পানি ছাড়াই-গ্রাম ও ঝোপঝাড় পেরিয়ে। খবর আলজাজিরার।

সরকার-সমর্থিত সুদানি সশস্ত্র বাহিনী (এসএএফ)-এর নিয়ন্ত্রণে থাকা উত্তর দারফুরের শেষ বড় শহর এল-ফাশের ঘিরে যখন লড়াই তীব্র হচ্ছিল, তখন দশ হাজারের বেশি মানুষ পশ্চিমের দিকে পালিয়ে যায়। তারা ঘরবাড়ি, সম্পদ-এমনকি পরিবারের সদস্যদেরও ফেলে যেতে বাধ্য হয়। অক্টোবরে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই এল-ফাশের প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে। “সশস্ত্র লোকজন আমাদের থামিয়ে সোনা, নগদ টাকা ও খাবারসহ সব মূল্যবান জিনিস লুট করে নেয়,” তাওইলা শরণার্থী শিবির থেকে আল জাজিরাকে বলেন মুস্তাফা। পথের মধ্যেই-তৃষ্ণা, আতঙ্ক আর একসঙ্গে ছুটে চলা হাজারো মানুষের ভিড়ে-তার ভাই নিখোঁজ হয়ে যায়। খোঁজাখুঁজি করা হলেও শেষ পর্যন্ত এগোতেই হয়েছে। ভাইয়ের ভাগ্যে কী ঘটেছে, আজও তিনি জানেন না।

আল জাজিরাকে তিনজন সুদানি শরণার্থী জানান, বোমাবর্ষণ ও অবরোধের মধ্যে থাকা এল-ফাশের থেকে পালিয়ে তাওইলা শিবিরে পৌঁছাতে তাদের যে যাত্রা করতে হয়েছে, তাতে শিবিরটির আগে থেকেই সীমিত সম্পদ চরম চাপে পড়েছে।

 ‘ভূতুড়ে শহর’ এল-ফাশের

চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (এমএসএফ) জানিয়েছে, জানুয়ারিতে তাদের দল এল-ফাশের সফর করে শহরটিকে কার্যত একটি ভূতুড়ে শহর হিসেবে দেখতে পেয়েছে। এমএসএফের আশঙ্কা, “আরএসএফ শহরটি দখলের সময় যারা জীবিত ছিল, তাদের অধিকাংশই হয় নিহত হয়েছে, নয়তো বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ”আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার  তথ্যমতে, আরএসএফের দখলের পর ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি মানুষ এল-ফাশের ছেড়ে পালিয়েছে-যাদের প্রায় ৭৫ শতাংশই আগে থেকেই অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষ ছিল। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি  জানায়, এখনো ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ মানুষ শহরের ভেতরে আটকা পড়ে আছে।

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যানিটারিয়ান রিসার্চ ল্যাবের নির্বাহী পরিচালক নাথানিয়েল রেমন্ড জানান, গত বছর এল-ফাশেরে আটকে থাকা এক ব্যক্তির সঙ্গে তার একটি বিরল ফোনালাপ হয়েছিল। “তাদের খাবার ও পানি ফুরিয়ে গিয়েছিল। চারদিকে লাশ পড়ে থাকতে দেখেছে। তারা কেবল রাতের বেলা বের হতে পারত,” বলেন তিনি। “একবারই আমরা ফোনে কথা বলতে পেরেছিলাম। এরপর আর যোগাযোগ হয়নি।”

 আরএসএফের বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ 

 প্রায় ১৮ মাস অবরোধের পর গত বছরের শেষ দিকে এল-ফাশের দখলে বড় ধরনের অভিযান চালায় আরএসএফ। শহরটির পতনের পর সেখানে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ শুরু হয় বলে অভিযোগ করেছে জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো। বিশেষ করে জাঘাওয়া ও ফুর জাতিগোষ্ঠীর অ-আরব জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ।

১৯ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের  উপ-মুখ্য কৌঁসুলি নাজহাত শামীম খান জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বলেন, এল-ফাশের দখলের সময় ও পরে আরএসএফ যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে। তিনি বলেন, শহরটির পতনের পর “চরম মানবিক দুর্ভোগের একটি পরিকল্পিত অভিযান” শুরু হয়, যা দারফুরের এক শহর থেকে আরেক শহরে পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। তাওইলা শিবিরের অধিকারকর্মী মারওয়ান মোহাম্মদ বলেন, নতুন করে আসা শরণার্থীরা এল-ফাশেরের পরিস্থিতিকে “জীবনে দেখা সবচেয়ে ভয়াবহ দৃশ্য” হিসেবে বর্ণনা করছে-রাস্তাঘাটে লাশ ছড়িয়ে ছিল।

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গণহত্যার প্রমাণ ধ্বংস করতে আরএসএফ পদ্ধতিগতভাবে মানবদেহের অবশেষ সরানোর চেষ্টা করেছে। নভেম্বরের শেষ নাগাদ এসব চিহ্নের ৭২ শতাংশ ছোট হয়ে যায় এবং ৩৮ শতাংশ সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যায়। একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এল-ফাশেরে গণকবর ও গোপন আটককেন্দ্রের অস্তিত্বের কথাও উঠে এসেছে, যেখানে বেসামরিক মানুষদের হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও অনাহারে রাখার অভিযোগ রয়েছে। আরএসএফ নেতা মোহাম্মদ হামদান “হেমেদতি” দাগালো অক্টোবরে কিছু নিপীড়নের ঘটনা স্বীকার করলেও মানবাধিকারকর্মীরা তার বক্তব্যে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।

তাওইলায় চরম মানবিক সংকট

 এল-ফাশের থেকে পালিয়ে আসা অধিকাংশ মানুষকে ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তাওইলা শরণার্থী শিবিরে পৌঁছাতে হয়। পথে আরএসএফের একাধিক চেকপোস্টে টাকা দিতে হয়। বর্তমানে তাওইলা এলাকায় ছড়িয়ে থাকা শিবিরগুলোতে আনুমানিক ১৪ লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। “আবহাওয়া খুব ঠান্ডা। আমাদের ঘুমানোর জন্য গদি নেই, গায়ে দেওয়ার কম্বল নেই। খাবারের অভাব, আর পানি পাওয়া ভীষণ কষ্টকর,” বলেন মুস্তাফা।

২৯ বছর বয়সী জাহরা মোহাম্মদ আলী আবাকার, যিনি জুনে পালিয়ে এসেছেন, বলেন,“আমরা খোলা আকাশের নিচে মাটিতে ঘুমাই। কোনো তাঁবু নেই; মানুষ বস্তা দিয়ে রোদ ও শীত থেকে বাঁচার চেষ্টা করছে।”সুদান ডক্টরস নেটওয়ার্ক জানিয়েছে, তাওইলার স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর তীব্র সংকট রয়েছে, শিশুদের উপযোগী খাবার ও নিরাপদ পানিরও অভাব।

চার মাস আগে এল-ফাশের থেকে পালিয়ে আসা আবদাল্লা আহমেদ ফাদুল আবু-জাইদ জানান, গোলাবর্ষণে তার বাঁ পা গুরুতর আহত হলে শহরে অস্ত্রোপচার করে পা কেটে ফেলতে হয় কারণ তখন আর চিকিৎসা সামগ্রী ছিল না। তাওইলায় আসার পর তার আট সদস্যের পরিবার মাত্র দুইবার সামান্য খাদ্য সহায়তা পেয়েছে, যা দ্রুত শেষ হয়ে যায়। “আমার ক্ষত এখনো নিয়মিত ড্রেসিং দরকার, কিন্তু হাসপাতালে যাওয়ার খরচ জোগাতে পারছি না,” তিনি বলেন। “আমার সন্তানরা আর আমি ভীষণ কষ্টে আছি।”

-বেলাল হোসেন