মার্কিন বিচার বিভাগ কর্তৃক দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টাইন সংক্রান্ত কয়েক লাখ পৃষ্ঠার নতুন নথি ফাঁস হওয়ার পর বিশ্ব রাজনীতিতে ভয়াবহ অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। শুক্রবার প্রকাশিত এই বিপুল নথিতে ভারত, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও স্লোভাকিয়ার মতো দেশগুলোর শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিত্বদের নাম আসায় রীতিমতো আন্তর্জাতিক শোরগোল পড়ে গেছে।
বিশেষ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী অনিল আম্বানির মধ্যকার যোগসূত্র এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে এপস্টাইনের মধ্যস্থতা নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।
প্রকাশিত নথিগুলো থেকে জানা যায়, ২০০৮ সালে যৌন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরও এপস্টাইনের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন রিলায়েন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান অনিল আম্বানি। ২০১৭ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার দুই মাস পর অনিল আম্বানি এপস্টাইনকে আইমেসেজের মাধ্যমে জানান, ভারতের শীর্ষ নেতৃত্ব ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের মানুষ যেমন জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ ব্যাননের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে আগ্রহী।
সেই বছরই মে মাসে মোদির সম্ভাব্য মার্কিন সফর এবং পরবর্তীতে ইসরায়েল সফরের বিষয়েও আম্বানি ও এপস্টাইনের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
ফাঁস হওয়া ইমেইলে দেখা যায়, ২০১৭ সালের ৬ জুলাই নরেন্দ্র মোদির ঐতিহাসিক ইসরায়েল সফরের নেপথ্যে এপস্টাইনের পরামর্শ ও প্রভাব কাজ করেছিল। মোদির সেই সফরের পর এপস্টাইন অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তিকে ইমেইলে লিখেছিলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী তার পরামর্শ গ্রহণ করেছেন এবং ট্রাম্পের সুবিধার জন্য ইসরায়েলে গিয়েছেন। তিনি উল্লাসের সঙ্গে দাবি করেন, এই কৌশল পুরোপুরি সফল হয়েছে। এই সফরের পরই ভারত ইসরায়েলের অস্ত্রের বৃহত্তম ক্রেতা হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং ফিলিস্তিন ইস্যুতে ভারতের দীর্ঘদিনের অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।
নথিতে আরও উঠে এসেছে, ২০১৯ সালের ভারতের লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদি বিশাল ব্যবধানে জয়ী হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এপস্টাইন এবং ট্রাম্পের সাবেক কৌশলবিদ স্টিভ ব্যাননের মধ্যে কথোপকথন হয়। সেখানে এপস্টাইন জানান, অনিল আম্বানি তার সঙ্গে দেখা করতে আসছেন এবং মোদি সরকার ব্যাননের চীন-বিরোধী দর্শনের প্রতি আস্থাশীল। এমনকি মোদি ও ব্যাননের মধ্যে একটি বৈঠকের আয়োজনের প্রস্তাবও দিয়েছিলেন এপস্টাইন। যদিও সেই বৈঠক শেষ পর্যন্ত হয়েছিল কি না, তার কোনো দাপ্তরিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এই নথিতে মোদির মন্ত্রিসভার বর্তমান সদস্য হরদীপ সিং পুরীর নামও গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে। সাবেক এই কূটনীতিবিদের সঙ্গে ২০১৪ সাল থেকেই এপস্টাইনের ইমেইল চালাচালি ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।
লিংকড-ইনের প্রতিষ্ঠাতা রিড হফম্যানকে ভারতে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করার বিষয়ে পুরী ও এপস্টাইন নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। নথিপত্র অনুযায়ী, নিউইয়র্কে এপস্টাইনের বিলাসবহুল বাড়িতে কমপক্ষে তিনবার বৈঠক করেছিলেন হরদীপ সিং পুরী। অবশ্য এই খবর প্রকাশের পর পুরী ভারতীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এপস্টাইনের সঙ্গে তার সমস্ত আলাপচারিতা ছিল একান্তই ব্যবসায়িক ও পেশাদার পর্যায়ের।
একজন দণ্ডিত যৌন অপরাধীর সঙ্গে বিশ্বনেতাদের এমন ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত আলোচনা নৈতিকভাবে বড় প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে মোদি সরকারের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ কিছু মোড় পরিবর্তনের পেছনে এপস্টাইনের মতো বিতর্কিত ব্যক্তির প্রভাবের ইঙ্গিত আসায় ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বিতর্কের ঝড় উঠেছে। এখন পর্যন্ত ভারতীয় সরকারের পক্ষ থেকে এই নথির বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে বিরোধী শিবির ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা এই তথ্যের গভীরতা নিয়ে নতুন করে বিচার-বিশ্লেষণ শুরু করেছেন।
-সাইমুন










