প্রকাশনা শিল্পকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষায় ২০ ফেব্রুয়ারির পরিবর্তে ঈদুল ফিতরের পর ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৬’ চান প্রকাশকরা। সেই সঙ্গে স্টল ও প্যাভিলিয়ন ভাড়া মওকুফ করা এবং সরকারি খরচে অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষার্থী ও পাঠকদের জন্য সরকারি ‘বই-ভাতা’ বা প্রণোদনা চালু করা এবং প্রতিটি মানসম্মত বইয়ের ন্যূনতম ৩০০ কপি সরকারিভাবে কেনার দাবি জানিয়েছেন তারা। আগামী ৯ ফেব্রুয়ারির মধ্যে এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট ঘোষণা না এলে বইমেলায় অংশ না নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন প্রকাশকরা।
সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান সর্বস্তরের প্রকাশকরা। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন প্রকাশনা সংস্থা ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) প্রকাশক ও ‘অমর একুশে বইমেলা কমিটি ২০২৬’-এর সদস্য মাহরুখ মহিউদ্দিন।
মাহরুখ মহিউদ্দিন বলেন, ‘বাংলাদেশের সৃজনশীল প্রকাশনা শিল্প আজ এক চরম অস্তিত্ব সংকটে দাঁড়িয়ে আছে। অমর একুশে বইমেলা কেবল বই বিক্রির স্থান নয়, এটি আমাদের জাতিসত্তা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু বাস্তবতা হলো আন্তর্জাতিক জরিপে পাঠাভ্যাসে বাংলাদেশ ১০২ দেশের মধ্যে ৯৭তম, দেশে প্রকাশিত ৯৫ শতাংশ বইয়ের প্রথম মুদ্রণ ৩০০ কপি বা তার কম, আর এর ৭০ শতাংশ বই সেই কপিও বিক্রি হয় না। বিগত দেড় বছরে বই বিক্রি কমেছে প্রায় ৬০ শতাংশ। উন্নত দেশে রাষ্ট্র যেখানে লাইব্রেরি ও পাঠকের জন্য হাজার হাজার কপি বই কিনে লেখক ও প্রকাশকদের সুরক্ষা দেয়, সেখানে আমাদের প্রকাশকরা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ঝুঁকিতে সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা থেকে বই প্রকাশ করে যাচ্ছেন। এই অবস্থায় টিকে থাকা নিছক ব্যবসা নয়, এটি এক ধরনের আত্মত্যাগ বা ‘স্যাক্রিফাইস’। তাই প্রকাশনা শিল্প রক্ষায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং এবারের বইমেলা ঈদের পরে আয়োজন এখন সময়ের দাবি।’
তিনি আরও বলেন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে আমরা তিনটি বাধার মুখোমুখি হবো। প্রথমত, ‘অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বাস্তবতা’ ফেব্রুয়ারির শুরুতেই রোজা ও সামনে ঈদ থাকায় মানুষের ব্যয় পোশাক ও খাদ্যে কেন্দ্রীভূত থাকে, উপরন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় প্রধান ক্রেতা শিক্ষার্থীরা ঢাকায় থাকবেন না; পাঠকশূন্য মেলায় স্টল নেওয়া নিশ্চিত লোকসান। দ্বিতীয়ত, ‘নির্বাচনকালীন লজিস্টিক সংকট’ প্রেস ও বাইন্ডিং শ্রমিক এবং স্টল নির্মাণের কারিগর পাওয়া কঠিন, নির্মাণসামগ্রীর দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়াতে তাড়াহুড়ো করে মেলা আয়োজন বাস্তবসম্মত নয়। তৃতীয়ত, ‘মানবিক ও ধর্মীয় বাস্তবতা (স্টল কর্মীদের সংকট)’ স্টলের অধিকাংশ কর্মী শিক্ষার্থী; ঈদের আগে তারা বাড়ি যেতে চাইবেন, যা ঠেকানো অমানবিক, আর রোজা রেখে সারাদিন কাজ করে ইফতারের পর ক্লান্ত শরীরে স্টলে দাঁড়িয়ে কাজ করা তাদের ধর্মীয় অনুভূতি ও মানবিক অধিকারের পরিপন্থী।
মাহরুখ মহিউদ্দিন বলেন, দেশের সৃজনশীল প্রকাশকদের মূল সংগঠন বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির (বাপুস) কাছে ইতোমধ্যে ২৬২ জন প্রকাশকের স্বাক্ষরিত চিঠিতে মেলা পেছানোর দাবি জানানো হয়েছে। আমরা সংস্কৃতি উপদেষ্টার কাছে স্মারকলিপি দিয়েছি। এই সংবাদ সম্মেলনের পর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছেও স্মারকলিপি দেব। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, এসব দাবি মানা না হলে ৯ ফেব্রুয়ারির পর থেকে ২৬২ জন প্রকাশকসহ সাধারণ প্রকাশকদের পক্ষে আসন্ন বইমেলায় অংশগ্রহণ করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে। আমরা মেলা চাই, কিন্তু ধ্বংসের পথে যেতে চাই না।
আদর্শ প্রকাশনার স্বত্বাধিকারী মাহাবুব রাহমানের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন অন্য প্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম ও প্রকাশনা সংস্থা ‘অনন্যা’র স্বত্বাধিকারী মনিরুল হক। এসময় উপস্থিত ছিলেন কাকলি প্রকাশনার স্বত্বাধিকারী নাসির আহমেদ, রিদম প্রকাশনা সংস্থার গফুর হোসেন, বাপুসের সাবেক সভাপতি আলমগীর শিকদার লোটন, ম্যাগনাম ওপাসের কর্ণধর আনোয়ার ফরিদী প্রমুখ।
সংবাদ সম্মেলন শেষে সর্বস্তরের প্রকাশকদের পক্ষে অ্যাডর্ন প্রকাশনা সংস্থার স্বত্বাধিকারী জাকির হোসেন ও আদর্শ প্রকাশনার স্বত্বাধিকারী মাহাবুব রাহমান প্রধান উপদেষ্টার কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দেন।
-সাইমুন










