‘রেডলাইন’: এমএসএফ নিষেধাজ্ঞার পর ইসরায়েলের হুমকি উপেক্ষা করে গাজায় কাজ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর

ছবিঃ সংগৃহীত

গাজায় ফিলিস্তিনিদের সহায়তা দেওয়া আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের কঠোর অবস্থানের মধ্যেই আরও আটটি এনজিও জানিয়েছে, তারা তাদের ফিলিস্তিনি কর্মীদের ব্যক্তিগত তথ্য ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করবে না। কর্মীদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে—এই আশঙ্কায় তারা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

অ্যাকশনএইড, আলিয়ানজা পর লা সোলিদারিদাদ, মেডসাঁ দ্যু মঁদ (Médecins du Monde), মেডিকোস দেল মুন্দো, প্রিমিয়ের আরজঁস ইন্টারন্যাশনাল, আমেরিকান ফ্রেন্ডস সার্ভিস কমিটি, মেডিকো ইন্টারন্যাশনাল এবং মেডিক্যাল এইড ফর প্যালেস্টিনিয়ানস-এই আটটি সংস্থা অক্সফাম ও ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (ফরাসি সংক্ষিপ্ত নাম এমএসএফ)-এর সঙ্গে একাত্ম হয়ে ইসরায়েলের নতুন নিবন্ধন শর্ত মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

প্রিমিয়ের আরজঁস ইন্টারন্যাশনালের এক মুখপাত্র আল জাজিরাকে বলেন, “এটি আমাদের জন্য একেবারে রেডলাইন। কর্মীদের তালিকা ইসরায়েলের কাছে দিলে তাদের জীবনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।”

মেডসাঁ দ্যু মঁদ এক বিবৃতিতে জানায়, “মানবিক সহায়তায় প্রবেশাধিকার কোনো ঐচ্ছিক বা রাজনৈতিক বিষয় নয়। আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের অধীনে ইসরায়েল নিঃশর্তভাবে ত্রাণ কার্যক্রম সহজতর করতে বাধ্য।”

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর এ পর্যন্ত ৫৫০ জনের বেশি ত্রাণকর্মী নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে এমএসএফ-এর ১৫ জন কর্মীও রয়েছেন।

গত ১ জানুয়ারি ইসরায়েল ৩৭টি ত্রাণ সংস্থার লাইসেন্স বাতিল করে। অভিযোগ ছিল, এসব সংস্থা তাদের কর্মী, অর্থায়ন ও কার্যক্রমসংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ করেনি। ইসরায়েলের ডায়াসপোরা বিষয়ক ও ইহুদিবিদ্বেষ প্রতিরোধ মন্ত্রণালয়ের বিধিমালা অনুযায়ী ‘নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার’ অজুহাতে পাসপোর্টের কপি, জীবনবৃত্তান্ত (সিভি) এবং শিশুদেরসহ পরিবারের সদস্যদের নাম জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

আল জাজিরা ৩৭টি সংস্থার সবার সঙ্গে যোগাযোগ করে। এর মধ্যে ১০টি সংস্থা স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তারা কর্মীদের তালিকা দেবে না। চারটি সংস্থা মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং বাকিরা কোনো জবাব দেয়নি। ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি জানায়, তারা “সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে” এবং জীবনরক্ষাকারী সহায়তা অব্যাহত রাখার পথ খুঁজছে।

‘মানবিক সহায়তা বাধাগ্রস্ত করার অজুহাত’

অ্যাকশনএইড বলেছে, এই শর্তগুলো “ফিলিস্তিনি জীবনধারণের অবকাঠামো ভেঙে ফেলার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার অংশ”। সংস্থাটির মতে, এসব নিয়ম মানবিক কাজের সঙ্গে সম্পর্কহীন রাজনৈতিক ও আদর্শিক শর্ত মানতে এনজিওগুলোকে বাধ্য করছে, যা আন্তর্জাতিক তথ্য সুরক্ষা মান, শ্রম আইন ও মানবিক নীতির পরিপন্থী।

ইসরায়েল গাজায় যুদ্ধের সময় মানবিক সহায়তাকে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দেশটির কর্মকর্তারা প্রমাণ ছাড়াই কিছু ফিলিস্তিনি ত্রাণকর্মীর বিরুদ্ধে হামাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে সহিংসতা উসকে দিয়েছেন।

ইসরায়েল দাবি করেছে, এমএসএফ যোদ্ধাদের নিয়োগ দিয়েছিল-যা সংস্থাটি দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে।

রোববার ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এমএসএফকে নির্দেশ দেয়, ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে গাজায় তাদের কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। বর্তমানে সংস্থাটি সেখানে ২০টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালনা করছে।

এমএসএফ এক বিবৃতিতে জানায়, “এটি মানবিক সহায়তা বাধাগ্রস্ত করার একটি অজুহাত।” সংস্থাটি আরও জানায়, কর্মীদের নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা ও চিকিৎসা কার্যক্রমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়ে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় তারা কর্মীদের নাম জমা দেয়নি।

গাজায় স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করা ব্রিটিশ-ফিলিস্তিনি সার্জন ঘাসসান আবু সিত্তাহ আল জাজিরাকে বলেন, “ইসরায়েলের এই প্রকল্প থেমে যায়নি। যুদ্ধবিরতির মধ্যেও স্বাস্থ্যব্যবস্থা ধ্বংসের প্রক্রিয়া চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে।”

তার মতে, ইসরায়েল ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্যব্যবস্থা ধ্বংস করে দেওয়ায় এখন এনজিওগুলোর ভূমিকা আগের চেয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। “বিশেষ করে এমএসএফের মতো সংস্থাগুলো প্রায় পুরোপুরি ফিলিস্তিনি কর্মীদের ওপর নির্ভর করে কাজ চালাচ্ছে।”

এমএসএফ জানায়, গাজার মোট হাসপাতাল শয্যার প্রায় ২০ শতাংশ তাদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ২০২৫ সালে সংস্থাটি আট লাখ চিকিৎসা সেবা দিয়েছে এবং গাজায় প্রতি তিনটি প্রসবের একটিতে সহায়তা করেছে—যা সহজে বিকল্প দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।

নতুন ‘জিএইচএফ’-ধাঁচের উদ্যোগের আশঙ্কা

এমএসএফ নিষিদ্ধ করার ঘোষণায় ইসরায়েল সরকার জানায়, সংস্থাটির ‘প্রস্থান’-এর পর “বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থার” কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। এই বক্তব্য চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

গাজায় স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করা জরুরি চিকিৎসক জেমস স্মিথ বলেন, “বড় ভয় হলো—ইসরায়েল আবার গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ)-এর মতো কিছু করবে।”

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-সমর্থিত জিএইচএফ ২০২৫ সালে গাজায় খাদ্য বিতরণের উদ্যোগ নেয়। তবে ছয় মাসে এর আশপাশে ইসরায়েলি বাহিনী ও বিদেশি নিরাপত্তা ঠিকাদারদের গুলিতে ৮৫০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হন।

স্মিথ বলেন, “ইসরায়েল মানবিকতার ভাষা ব্যবহার করে এমন ছদ্ম-মানবিক কাঠামো তৈরি করবে, যেগুলোর ওপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে এবং সেগুলো সহায়তার বদলে সহিংসতা ও দুর্ভোগ বাড়াবে।”

মেডিকো ইন্টারন্যাশনাল আল জাজিরাকে জানায়, নিবন্ধন প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য এনজিওগুলোকে ইসরায়েলের সিদ্ধান্তের সঙ্গে বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত করা, আর তা না মানলে তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা।

মেডিক্যাল এইড ফর প্যালেস্টিনিয়ানস এই আদেশকে “মানবিক সংস্থাগুলোকে নীরব, নিয়ন্ত্রিত ও সেন্সর করার উদ্দেশ্যে নেওয়া রাজনৈতিক আক্রমণ” হিসেবে আখ্যা দিয়ে জানায়, তারা কোনো নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় অংশ নেবে না।

সংস্থাটি বলেছে, “আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে ইসরায়েলের দায়িত্ব হলো দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা-তা বাধাগ্রস্ত করা বা অপরাধে পরিণত করা নয়।”

বেলাল হোসেন/