মার্কিন নিরাপত্তা হুমকির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান কিউবার, চাপ বাড়াচ্ছে ওয়াশিংটন

ছবিঃ সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি- এমন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে কিউবা। একই সঙ্গে হাভানা জানিয়েছে, তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে ‘গঠনমূলক সম্পৃক্ততা’ ও সহযোগিতার জন্য প্রস্তুত। এ অবস্থায় কিউবার ওপর চাপ বাড়াতে দেশটির তেল সরবরাহ বন্ধের উদ্যোগ জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র।

সোমবার কিউবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে সংলাপের আহ্বান জানিয়ে স্পষ্টভাবে জানায়, কিউবা কোনোভাবেই “সন্ত্রাসবাদকে” সমর্থন করে না। ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোর অপহরণের পর যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার মধ্যে উত্তেজনা নতুন করে বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এ বিবৃতি আসে। ওই অপহরণকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পশ্চিম গোলার্ধে প্রভাব বিস্তারের কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। খবর আলজাজিরার।

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘গঠনমূলক সম্পৃক্ততা, আইনসম্মত সহযোগিতা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মাধ্যমে কিউবা ও যুক্তরাষ্ট্র-উভয় দেশের জনগণই উপকৃত হতে পারে।’

এতে আরও বলা হয়, ‘পারস্পরিক স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে বাস্তব ফলাফল অর্জনের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে সম্মানজনক ও পারস্পরিক সংলাপ বজায় রাখতে কিউবা আগ্রহী।’

এই বিবৃতি আসে এমন এক সময়, যখন ট্রাম্প দাবি করেন যে কিউবার সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরায় শুরু হয়েছে এবং তার প্রশাসন কিউবা সরকারের ‘সর্বোচ্চ পর্যায়ের’ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করছে।

রোববার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ‘কিউবা দীর্ঘদিন ধরেই একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র। এখন ভেনেজুয়েলার সমর্থনও তারা আর পাচ্ছে না।’

একসময় কিউবার প্রধান জ্বালানি সরবরাহকারী ছিল ভেনেজুয়েলা। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশটিতে তেল সরবরাহ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবীয় অঞ্চলে ভেনেজুয়েলার তেলবাহী ট্যাংকার জব্দ করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে, যা সমালোচকদের মতে ‘সমুদ্র ডাকাতির’ শামিল।

তেলের বাইরে মাদুরো সরকারের সঙ্গে কিউবার ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক ছিল। মাদুরোর অপহরণের সময় প্রায় ৫০ জন কিউবান সেনা নিহত হন বলে জানা গেছে।

এদিকে কিউবাকে তেল সরবরাহ বন্ধে মেক্সিকোর ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে ট্রাম্প প্রশাসন। বিশ্লেষকদের মতে, সম্পূর্ণ জ্বালানি অবরোধ আরোপ করা হলে কিউবায় মারাত্মক মানবিক সংকট দেখা দিতে পারে।

১৯৫৯ সালে ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে কিউবার বিপ্লবের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত শাসক ফুলহেনসিও বাতিস্তার পতনের পর থেকেই হাভানা ও ওয়াশিংটনের সম্পর্ক বৈরী। ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে, ২০২১ সালে, কিউবাকে ‘সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেন।

গত সপ্তাহে হোয়াইট হাউস এক স্মারকলিপিতে কিউবাকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘অস্বাভাবিক ও গুরুতর হুমকি’ হিসেবে আখ্যা দেয়। এতে অভিযোগ করা হয়, কিউবা চীন ও রাশিয়ার মতো ‘দুষ্ট রাষ্ট্রীয় শক্তির’ সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত—যদিও একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই মস্কো ও বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছে।

এই অভিযোগের জবাবে কিউবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, দেশটিতে কোনো বিদেশি সামরিক বা গোয়েন্দা ঘাঁটি নেই।

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘কিউবা কোনোভাবেই সন্ত্রাসী বা চরমপন্থি সংগঠনকে আশ্রয়, সমর্থন, অর্থায়ন কিংবা কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেয় না।’

এতে আরও বলা হয়, ‘সন্ত্রাসবাদ ও অর্থপাচারের অর্থায়নের বিরুদ্ধে কিউবা শূন্য সহনশীলতার নীতি অনুসরণ করে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী অবৈধ আর্থিক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি দীর্ঘদিনের কঠোর অবস্থানের পর কিউবার এই বক্তব্যে কিছুটা নমনীয়তার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, কিউবার সঙ্গে আলোচনায় তার প্রধান দাবি কিউবান–আমেরিকানদের সঙ্গে দেশটির আচরণ।

রোববার ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের দেশে বসবাসকারী অনেক মানুষ কিউবায় খুব খারাপ আচরণের শিকার হয়েছেন। তারা সবাই আমাকে ভোট দিয়েছে, এবং আমরা চাই তারা যেন সম্মানের সঙ্গে নিজেদের দেশে ফিরতে পারেন।’

এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও-যিনি কিউবান বংশোদ্ভূত-লাতিন আমেরিকায় কঠোর নীতির পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন।

রোববার ভ্যাটিকান থেকে পোপ লিও যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘সহিংসতা এড়াতে এবং কিউবার জনগণের দুর্ভোগ না বাড়াতে সব পক্ষকে আন্তরিক ও কার্যকর সংলাপের পথে এগিয়ে আসতে হবে।’

-বেলাল হোসেন