হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিলে কী হতে পারে, কেন এতো গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালী

ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনার মধ্যে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে উত্তাপ আরও বাড়ছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে। বিশ্ব তেল বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যে জলপথ দিয়ে যায়, সেই প্রণালীতে আজ রবিবার থেকে সরাসরি গোলাবর্ষণসহ নৌ মহড়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। এতে জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, সবই এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে রয়েছে।

সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজ বলছে, ইরান ও ওমানকে আলাদা করা সরু সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালী ফের বিশ্ব ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটির সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশ মাত্র ৩৩ কিলোমিটার চওড়া হলেও এর মাধ্যমেই আরব উপসাগর যুক্ত হয়েছে ওমান উপসাগর ও বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে।

এই প্রণালী দিয়েই প্রতিদিন বিশ্বে বাণিজ্য হওয়া মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। ফলে সামান্য সময়ের জন্যও যদি এই পথে তেল পরিবহনে বিঘ্ন ঘটে, তা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিতে পারে।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ঘোষণা দিয়েছে, ১ ফেব্রুয়ারি থেকে হরমুজ প্রণালীতে দুই দিনের সরাসরি গোলাবর্ষণসহ নৌ মহড়া চালানো হবে। একাধিক গণমাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। এই মহড়ার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যবহৃত নৌ চলাচলের পথে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

হরমুজ প্রণালী কেন এতো গুরুত্বপূর্ণ
হরমুজ প্রণালী ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত এবং এটি আরব উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশ প্রায় ৩৩ কিলোমিটার চওড়া। এটিকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ‘চোকপয়েন্ট’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

প্রতিদিন বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে যায়। কাতারসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানির ক্ষেত্রেও এই প্রণালী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই পথে যাতায়াতের জন্য নির্ধারিত শিপিং লেনগুলো প্রতিটি দিকেই মাত্র কয়েক কিলোমিটার চওড়া। তবে প্রণালীটি এতটাই গভীর যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলবাহী জাহাজও এখানে চলাচল করতে পারে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর বেশিরভাগেরই তেল রপ্তানির বিকল্প কোনও পথ নেই। তাই এই রুটে চলাচলে সামান্য বিঘ্নও তেলের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। যদিও এটি আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে স্বীকৃত, তবু এটি কয়েকটি দেশের আঞ্চলিক জলসীমার পাশ ঘেঁষে রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কতা
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) প্রকাশ্যে ইরানকে সতর্ক করেছে। তারা বলেছে, মহড়াটি যেন নিরাপদ ও পেশাদারভাবে পরিচালনা করা হয় এবং এমন কোনও আচরণ না করা হয়, যাতে বাণিজ্যিক জাহাজ বা যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র দেশগুলোর নৌবাহিনী ঝুঁকিতে পড়ে।

এই উত্তেজনার পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন। ইরানের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একঘরে হয়ে পড়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিসহ সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

এর মধ্যে আরব সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন থাকাও উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে কী হতে পারে
হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে, এমনকি অল্প সময়ের জন্যও যদি বন্ধ হয়, তাহলে তার প্রভাব পড়বে সারা বিশ্বে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে।

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি খরচ বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে পরিবহন, খাদ্যপণ্য ও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে। আর সেই পরিস্থিতিতে এশিয়া ও ইউরোপের জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো তাৎক্ষণিকভাবে সংকটে পড়বে।

এছাড়া তেলবাহী জাহাজগুলো বিকল্প পথে ঘুরে যেতে বাধ্য হলে পরিবহনও বিলম্বিত হবে এবং ভাড়াও বাড়বে। জাহাজ বিমার খরচ বেড়ে যাবে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ব্যয় আরও বাড়াবে। শেয়ারবাজারেও ধস নামতে পারে, বিশেষ করে জ্বালানি-নির্ভর খাতে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে বড় অর্থনীতির দেশগুলো তাদের কৌশলগত তেল মজুত ব্যবহার করতে পারে। তবে সংকট দীর্ঘ হলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ধাক্কা খাবে। আর সেটার সবচেয়ে বড় চাপ পড়বে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর।

আগের ঘটনাগুলোর প্রেক্ষাপট
১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় উপসাগরে তেলবাহী জাহাজে হামলা চালানো হয়। ইতিহাসে সেই ঘটনাটি ‘ট্যাংকার যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। ২০১১–১২ সালে ইরান একাধিকবার প্রণালী বন্ধের হুমকি দিয়েছিল, যদিও বাস্তবে তা বন্ধ করা হয়নি। তবু ইরানের হুমকির জেরেই তেলের দাম বেড়ে যায়।

-সাইমুন