র্আকটিকের স্নিগ্ধ নীরবতায় মানুষের কোলাহল

ছবিঃ সংগৃহীত

একসময় পৃথিবীর সবচেয়ে নীরব অঞ্চলগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল আর্কটিক। সেখানকার পুরু বরফের আস্তরণ ঢেকে রাখত সমুদ্র; আটকে দিত ঢেউয়ের শব্দ। সীমিত ছিল জাহাজ চলাচল। বহুদূরে ছিল শিল্পকারখানা, ভারী কাজ। কিন্তু আর্কটিকের সেই নীরবতা দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বরফ গলছে; খুলছে নতুন জলপথ। এর সঙ্গে বাড়ছে মানুষের উপস্থিতি ও কোলাহল।

বরফ গলার ফলে আর্কটিকে বাড়ছে নৌযান, উড়োজাহাজ ও স্নো-মোবাইলের চলাচল। দৃশ্যমান এসব পরিবর্তনের পাশাপাশি চোখের আড়ালে ঘটছে আরেকটি গভীর রূপান্তর– পানির নিচে শব্দদূষণ। ইঞ্জিন থেমে গেলেও শব্দ রয়ে যায়। ছড়িয়ে পড়ে শীতল উত্তরের সমুদ্রে বহুদূর পর্যন্ত।

পানির নিচে শব্দ স্থলভাগে আলোর মতো গুরুত্বপূর্ণ। আর্কটিক অঞ্চলের বহু প্রাণী– বিশেষ করে তিমি ও সিল চলাচল, যোগাযোগ, শিকার ও বিপদ এড়াতে শব্দের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু মানুষের তৈরি শব্দ যখন সেই পরিবেশে ঢুকে পড়ে, তখন প্রাণীদের স্বাভাবিক সংকেত আর স্পষ্ট থাকে না। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত শব্দের কারণে অনেক সময় তিমি ও সিল তাদের পরিচিত খাদ্য সংগ্রহ বা যাতায়াতের এলাকা ছেড়ে চলে যায়। এতে তাদের শক্তি ও সময়– দুটোরই অপচয় হয়।

এ প্রভাব মানুষের জীবনেও পড়ছে। আর্কটিকের অনেক আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর খাদ্যসংস্থান এখনও শিকার ও মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। শব্দের কারণে প্রাণীরা যদি পরিচিত এলাকা
এড়িয়ে চলে, তাহলে শিকারের পথ হয়ে ওঠে দীর্ঘ ও অনিশ্চিত। আবহাওয়ার কঠোরতার মধ্যে এমন অনিশ্চয়তা বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি করে।
অনেকে মনে করেন, বড় জাহাজই পানির নিচের শব্দের প্রধান উৎস। কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। উপকূলের কাছাকাছি চলা ছোট নৌকা, বরফের ওপর চলাচলকারী স্নো-মোবাইল (বরফে চলা এক ধরনের গাড়ি), এমনকি উড়োজাহাজও পানির নিচে শব্দ তৈরি করে। এসব শব্দের বেশির ভাগই উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির, যা প্রচলিত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় ধরা পড়ে না। ফলে প্রকৃত শব্দচিত্র অনেক সময় অজানাই থেকে যায়।

আর্কটিকের এ বাস্তবতা তুলে ধরেছেন যুক্তরাজ্যের বাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। আর্কটিক কানাডায় টানা এক দশক ধরে সংগৃহীত শব্দতথ্য বিশ্লেষণ করে তারা দেখিয়েছে, বরফের উপস্থিতি পানির নিচের শব্দের ধরন ও মাত্রা আমূল বদলে দেয়। খোলা সমুদ্রের জন্য তৈরি শব্দদূষণ নীতিমালা তাই আর্কটিকে কার্যকর নয়।
গবেষণার প্রধান লেখক ড. ফিলিপ ব্লঁদেল বলেন, আর্কটিকের শব্দ পরিবেশ একেবারেই আলাদা। এখানে বরফ শব্দকে কখনও আটকে দেয়, কখনও ছড়িয়ে দেয় আবার কখনও রূপ বদলে ফেলে। তাই একক মানদণ্ড এখানে খাটে না।

গবেষণাটি ইউরোপীয় সামুদ্রিক নীতিমালাসহ আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ নতুন করে পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়েছে। গবেষকদের মতে, আর্কটিকের বাস্তব পরিস্থিতি অনুযায়ী শব্দের মাত্রা ও ফ্রিকোয়েন্সি নির্ধারণ করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। ড. ব্লঁদেল বলেন, ‘আমরা আর্কটিককে পুরোপুরি নীরব করতে চাই না। স্থানীয় ছোট নৌযানের মতো অনেক শব্দের প্রভাব এখানে নগণ্য। আবার বরফ ভাঙার স্বাভাবিক শব্দের তুলনায় কিছু মানবসৃষ্ট শব্দ তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়।’

তবে কোন শব্দ কখন, কোথায় এবং কীভাবে প্রভাব ফেলছে, তা বোঝার জন্য বিস্তৃত ও ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ জরুরি। তাদের এ গবেষণায় ওশান নেটওয়ার্কস কানাডার সংগৃহীত দীর্ঘমেয়াদি তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।
গবেষকদের মতে, দ্রুত বদলে যাওয়া এ অঞ্চলে কার্যকর ব্যবস্থাপনার একমাত্র উপায় হলো আর্কটিকের নিজের শব্দ শোনা। এতে মানুষের মাধ্যমে হওয়া পরিবর্তন সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।

সূত্র: আর্থ ডটকম।

বেলাল হোসেন/