যুদ্ধের প্রস্তুতিতে ইরানের প্রশাসন, কূটনৈতিক তৎপরতাও অব্যাহত

ছবিঃ সংগৃহীত

মার্কিন সামরিক হামলার আশঙ্কা জোরালো হওয়ায় ইরানের প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীতে ব্যাপক যুদ্ধপ্রস্তুতি চলছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাত এড়াতে আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতাও অব্যাহত রেখেছে তেহরান।

ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশ রক্ষায় সামরিক ও বেসামরিক-দুই পর্যায়েই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের নেতারাও হামলা এড়ানো এবং ওয়াশিংটন-তেহরান সমঝোতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করছেন।

এই প্রেক্ষাপটে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি শুক্রবার তুরস্কে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেবেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে চায় ইরান।

এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনের নেতৃত্বে একটি নৌবহর ইরানের জলসীমার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এর পরপরই ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক, সামরিক ও বিচার বিভাগীয় নেতারা একাধিকবার প্রতিরক্ষার বার্তা দেন।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, ইরানের আলোচক দলের জ্যেষ্ঠ সদস্য কাজেম গরিবাবাদি বলেছেন, “এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা নয়, বরং দেশ রক্ষায় ২০০ শতাংশ প্রস্তুতিই তেহরানের অগ্রাধিকার।” মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে এ বার্তা ওয়াশিংটনকে জানানো হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

সেনাবাহিনীর প্রস্তুতি জোরদার

গত বছরের জুনে সংঘাতের পর থেকেই সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে বিশেষ নজর দিচ্ছে ইরান। ওই সময় কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন এবং পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা হয়। এরপর ধারাবাহিকভাবে সামরিক মহড়া চালিয়ে আসছে দেশটি।

ইরানি সেনাবাহিনী বৃহস্পতিবার জানায়, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এক হাজার ড্রোন বাহিনীতে যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘ওয়ান-ওয়ে সুইসাইড ড্রোন’, নজরদারি ড্রোন, যুদ্ধবিমান-সমর্থিত এবং সাইবার যুদ্ধ সক্ষম ড্রোন, যা স্থল, আকাশ ও সমুদ্রে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।

সেনাপ্রধান আমির হামাতি বলেন, বিদ্যমান হুমকির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দ্রুত যুদ্ধ পরিচালনা এবং যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দিতে কৌশলগত সক্ষমতা আরও জোরদার করা হয়েছে।

এর আগেও ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে।

সাধারণ মানুষের উদ্বেগ

তেহরানসহ সারা দেশে সাধারণ মানুষ ট্রাম্পের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য-একদিকে হুমকি, অন্যদিকে আলোচনার ইঙ্গিত ঘিরে উৎকণ্ঠায় রয়েছেন।

নিরাপত্তাজনিত কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তেহরানের এক তরুণী আলজাজিরাকে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র যদি হামলা চালায়, ইরান তার কঠোর জবাব দেবে।”

তবে ভিন্ন মতও রয়েছে। এক শিক্ষার্থী বলেন, “আরেকটি সংঘাত শুরু হলে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” ৫০ বছর বয়সী এক বাসিন্দার ভাষ্য, “যুদ্ধ মানেই ধ্বংস ও বিপর্যয়। আমরা কেউই তা চাই না।”

প্রশাসনিক প্রস্তুতি

সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে বেসামরিক প্রস্তুতিও বাড়াচ্ছে ইরানি সরকার। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সীমান্তবর্তী প্রদেশগুলোর গভর্নরদের বিশেষ ক্ষমতা দিয়েছেন, যার মধ্যে জরুরি পণ্য আমদানির অনুমোদনও রয়েছে।

আকাশপথে হামলার ঝুঁকি বিবেচনায় গণ-আশ্রয়কেন্দ্রের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তেহরানের মেয়র আলিরেজা জাকানি জানিয়েছেন, ‘ভূগর্ভস্থ পার্কিং শেল্টার’ নির্মাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তবে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন কোনো সংঘাত শুরু হলে যোগাযোগ ব্যবস্থা আবারও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে-যা আগের সংঘাত ও সাম্প্রতিক বিক্ষোভের সময় দেখা গেছে।

বেলাল হোসেন/