ইরানে সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করার পর দেশজুড়ে ব্যাপক গণগ্রেপ্তার ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে। সাদা পোশাকধারী নিরাপত্তা বাহিনী নতুন করে যেন কোনো আন্দোলন গড়ে না ওঠে, সে লক্ষ্যেই এই অভিযান চালাচ্ছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন সূত্র। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাঁচ মানবাধিকারকর্মীর বরাতে জানা গেছে, সাদা পোশাকের নিরাপত্তা বাহিনী প্রধান সড়ক ও চেকপয়েন্টের আশপাশে উপস্থিতি বাড়িয়ে নির্বিচারে মানুষকে গ্রেপ্তার করছে। আটক ব্যক্তিদের গোপন স্থানে রাখা হচ্ছে, যাদের অবস্থান সম্পর্কে পরিবারগুলো কোনো তথ্য পাচ্ছে না।
এক মানবাধিকারকর্মী জানান, “যাকে পাচ্ছে তাকেই ধরে নিয়ে যাচ্ছে। কেউ জানে না, তাদের কোথায় নেওয়া হচ্ছে বা কী অবস্থায় রাখা হচ্ছে। গণহারে গ্রেপ্তার ও লাগাতার হুমকির মাধ্যমে সমাজে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করাই তাদের উদ্দেশ্য।”
এই একই তথ্য বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন আইনজীবী, প্রত্যক্ষদর্শী এবং কয়েকজন ইরানি কর্মকর্তা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এমনকি কয়েক বছর আগের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদেরও নতুন করে আটক করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ডিসেম্বরের শেষ দিকে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা দ্রুত রাজনৈতিক রূপ নেয়। প্রায় পাঁচ দশকের মধ্যে ইসলামি শাসনের জন্য সবচেয়ে বড় সংকটে বিক্ষোভকারীরা সরাসরি শাসকগোষ্ঠীর পদত্যাগ দাবি করে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে বিক্ষোভ দমন করা হয়েছে। তবে তেহরান কর্তৃপক্ষ সহিংসতার জন্য ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের’ দায়ী করছে। সরকারের ভাষ্যমতে, নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার ১১৭ জন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, বিক্ষোভে মোট নিহতের সংখ্যা ৬ হাজার ৩৭৩ জন। এর মধ্যে ৫ হাজার ৯৯৩ জন বিক্ষোভকারী, ২১৪ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, ১১৩ জন শিশু-কিশোর এবং ৫৩ জন পথচারী রয়েছেন। গ্রেপ্তারের সংখ্যা পৌঁছেছে ৪২ হাজার ৪৮৬ জনে।
চিকিৎসকদের বরাতে জানা গেছে, আহত বহু বিক্ষোভকারীকে হাসপাতাল থেকেই তুলে নিয়ে গেছে নিরাপত্তা বাহিনী। আহতদের চিকিৎসা দেওয়া কিছু চিকিৎসক ও নার্সকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে অথবা তলব করা হয়েছে। আটক তরুণদের পরিবারগুলো চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
ইরানের এই অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের হুমকিতে যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়ছে। তিনি সতর্ক করেছেন, ইরান যদি পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় না আসে, তবে পরবর্তী মার্কিন হামলা গত জুনের বিমান হামলার চেয়েও ভয়াবহ হবে।
পশ্চিমা সূত্রগুলোর দাবি, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী ও নেতৃত্বের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পরিকল্পনা করছে, যা বিক্ষোভকারীদের আরও উৎসাহিত করতে পারে। তবে আঞ্চলিক বিশ্লেষকদের মতে, কেবল আকাশপথে হামলা চালিয়ে কয়েক দশকের পুরনো এই শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো সম্ভব নয়।










