বুধবার (২৮ জানুয়ারি) রাত সোয়া ৮টার দিকে তাকে উদ্ধার করা হয়। এর আগে বিকেল ৪টার দিকে রাউজান উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের জয়নগর গ্রামে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শিশুটি অসাবধানতাবশত খোলা নলকূপের গর্তে পড়ে যায়। পরে বিষয়টি টের পেয়ে স্বজন ও স্থানীয়রা দ্রুত ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেন। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে শিশুটিকে উদ্ধারে অভিযান শুরু করে।
চট্টগ্রামের রাউজানের কদলপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের জয়নগর গ্রামের আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ঘরে থাকেন রাশেদা আক্তার। ঘরের এক কোণে আলমারির পাশে হেলান দিয়ে বসে কথাগুলো বলছিলেন তিনি। ছেলের কথা বলতে বলতে বুক চাপড়ে হালকা হতে চেষ্টা করেন। শূন্য চোখে তাকিয়ে থাকেন সামনের দিকে। গতকাল বুধবার বিকেলে ঘরের অদূরে খুঁড়ে রাখা গভীর নলকূপ বসানোর গর্তে পড়ে সারা যায় তার নাড়িছেঁড়া ধন। মাত্র ৩ বছর ২ মাস তার। এমন বয়সের শিশুদের প্রতিটি কথা আদরের মতো কানে লেগে থাকে মায়ের। সেই কথাগুলো যেন এখন তাকে বারবার ঝাঁকুনি দিয়ে যাচ্ছিল। সেসব স্মৃতি আর কান্নার দমকে কেঁপে উঠছিলেন রাশেদা।
রাশেদার পাশে কয়েকজন নারী সান্ত্বনা জানাতে গিয়ে নিজেরও চোখ মুছছিলেন। এর মধ্যেই ঘরে ঢোকেন মেজবাহর বাবা সাইফুল আলম। শোকার্ত স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনিও। দেয়ালে মাথা ঠুকে ঠুকে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বলতে থাকেন, ‘আঁর ফুত হডে, আঁর ফুত হডে’ (আমার ছেলে কোথায়)।
মূল সড়ক থেকে দেড় কিলোমিটার ভেতরে জয়নগর গ্রামের এক কোণে একটি টিলার ওপর আশ্রয়ণ প্রকল্প। সেখানে টিনের ছাউনি দেওয়া সারি সারি ৩০টির মতো আধপাকা বাড়ি। তারই একটিতে থাকেন সাইফুল-রাশেদা দম্পতি। আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে সেখানে গেলে চোখে পড়ে গভীর নলকূপের গর্তটি। গর্ত খোঁড়া হলেও নলকূপ বসেনি আর। সেখানে পড়েই মৃত্যু শিশু মেজবাহর।
মেজবাহর বাবা সাইফুল পেশায় ইলেকট্রিশিয়ান। ঘটনার সময় তিনি আরেক গ্রামে বিদ্যুতের কাজ করতে গিয়েছিলেন। খবর পেয়ে ফিরে এসে গর্তে রশি ফেলে ছেলেকে ওঠানোর অনেক চেষ্টা করেন। কিন্তু সব চেষ্টা বিফলে গেছে।
সাইফুল বলেন, ‘সরকারের মানুষজনের গাফিলতির কারণে আজ আমি ছেলেহারা হয়েছি। এখানে যখন ২০২০ সালে পাইপ বসানো হয়, তখন আমরা আশ্রয়ণের ঘরে উঠিনি। গত দুই বছর আগে আমরা এখানে ঘর বরাদ্দ পাই। জানতাম না ঘরের পাশে একটা মৃত্যুকূপ খুঁড়ে রেখেছে সরকারি লোক। সরকার যদি টিউবয়েল না–ই বসায়, তাহলে গর্ত কেন খুঁড়ল? কেন তাতে ঢাকনা দেওয়া হয়নি? আমার ছেলেকে এখন কেউ কি ফিরিয়ে দিতে পারবে?’
কথায়–কান্নায় বিলাপের ফাঁকে রাশেদা বললেন, ‘গতকাল বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ঘুম থেকে উঠে মেজবাহ আমার মেয়ে জান্নাতুলের সঙ্গে বাইরে খেলতে যায়। ১০ মিনিট পর শুনি, সে খেলতে খেলতে গর্তে পড়ে গেছে।’
সাইফুল আলম চোখ মুছে জানালেন, গর্ত থেকে তিনিও ছেলের কান্নার শব্দ শুনেছিলেন। রশি ফেলে বারবার মেজবাহ মেজবাহ ডাক দিয়ে ছেলেকে রশি ধরতে বলেন। কিন্তু পারেনি ছেলেটা।
নিখোঁজ শিশুর পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মেজবাহদের বাড়ি থেকে ৩০ থেকে ৪০ ফুট দূরে গত ৪–৫ বছর আগে সরকারিভাবে গভীর নলকূপের জন্য গর্ত খোঁড়া হয়। তবে নলকূপ বসানো হয় আরও ১০ ফুট দূরে। আগে খোঁড়া গর্ত ভরাট করা হয়নি আর।
গতকাল বিকেল সাড়ে চারটার দিকে মেজবাহ গর্তে পড়ে যায়। চার ঘণ্টা পর রাত সাড়ে আটটার দিকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা রাত আটটার দিকে তাকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে। রাতেই জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করা হয় তাকে।
দায়ী কে
রাউজান উপজেলা প্রশাসন ও জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, আশ্রয়ণ প্রকল্পটিতে ২০২০ সালে গভীর নলকূপ স্থাপনের জন্য প্রথমে একটি গর্ত খোঁড়া হয়। পরে সেখানে পানি পাওয়া না যাওয়ায় পাশে আরেকটি গর্ত করে সেখানে নলকূপ বসানো হয়। তবে আগের খোঁড়া গর্তটি ভরাট করে দিয়ে যায়নি সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার। নলকূপটি বসানোর কাজটি পায় মেসার্স আঁখি ইন্টারন্যাশনাল।
আঁখি ইন্টারন্যাশনালের মালিক মুহাম্মদ আজমের কাছে বিষয়টি নিয়ে জানতে তাঁর মুঠোফোনে কল দিলেও তিনি ধরেননি।
-মামুন










