সময়ের সঙ্গে বদলেছে নাটকের শুটিংয়ের দৃশ্যপট

নাটকের শুটিং মানে এক সময় ছিল অপেক্ষা, প্রস্তুতি আর ধৈর্যের পরীক্ষা। কাকডাকা ভোর থেকেই শিল্পী ও কলাকুশলীরা সেটে জড়ো হতেন । হাতে থাকত কাগজে ছাপা স্ক্রিপ্ট, বারবার পড়া সংলাপ, আর দৃশ্য বুঝে নেওয়ার জন্য দীর্ঘ আলোচনা। শুটিং সেট তখন শুধু কাজের জায়গাই ছিল না, শেখার স্কুল, গল্পের আড্ডা আর অভিজ্ঞতর সম্মিলনে এক মিলনমেলা।

সময় বদলেছে। সঙ্গে বদলছে দৃশ্যপটও। এখনকার নাটক শুটিং মানেই দ্রুত, চাপ আর সময়ের সঙ্গে দৌড়। অতীতে নাটকের শুটিংয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল প্রস্তুতি। নির্মাতা, অভিনেতা ও কলাকুশলীদের মধ্যে দৃশ্য নিয়ে আলাপ হতো আগেই। রিহার্সাল ছিল স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। একাধিকবার মহড়া দিয়ে চরিত্র দাঁড় করানো হতো, ক্যামেরা অন হওয়ার আগেই অভিনেতা জানতেন তার চরিত্রের ভেতরের গতি কী। এখন সেই প্রস্তুতির জায়গা অনেকটাই সংকুচিত। অনেক সময় শুটিং সেটেই প্রথমবার স্ক্রিপ্ট পড়ে সংলাপ মুখস্থ করতে হয়। রিহার্সালের বদলে ‘টেক’ দিয়েই সব সামাল দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে।

আগের নাটকের শুটিংয়ে সময় ছিল তুলনামূলক বেশি, কিন্তু তাড়া ছিল কম। শুটিং ইউনিট জানত একটি দৃশ্য ভালো না হলে আবার করা হবে। ক্যামেরা চলত কম, আলোচনা চলত বেশি। বর্তমান সময়ের শুটিংয়ে চিত্রটা উঠটো। সময় কম, দৃশ্য বেশি। প্রতিটি মিনিটের হিসাব করতে হয় বাজেট দিয়ে। ফলে একটি দৃশ্য ঠিকঠাক দাঁড়াল কি না, তার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে ‘ক্যাপচার হলো কি না’ প্রশ্নটি। একটা সময় শুটিং সেটে সিনিয়র শিল্পীদের উপস্থিতি ছিল নিয়মিত। সেসময় তারা শুধু অভিনয় করতেন না, তরুণদের শেখাতেনও। সেট ছিল এক ধরনের শিক্ষাকেন্দ্র। আজকের সেটে সেই দৃশ্য অনেকটাই বিরল। সিনিয়র শিল্পীরা কম আসেন, তরুণরা দ্রুত কাজ শেষ করে পরের শুটিংয়ে ছুটে যান। শেখা ও শেখানোর সম্পর্কটি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়েছে। অতীতে শুটিং সেটে শৃঙ্খলা ছিল এক ধরনের অলিখিত নিয়ম। নির্দিষ্ট সময়, নির্দিষ্ট দায়িত্ববোধ সবাই মেনে চলত। এখন কাজের চাপ, একসঙ্গে একাধিক প্রজেক্ট আর সময়ের অভাবে সেই শৃঙ্খলা অনেক ক্ষেত্রেই ভেঙে পড়ছে। দেরি, তাড়াহুড়া আর মানসিক চাপ শুটিংয়ের স্বাভাবিক অংশ হয়ে উঠেছে।

তবু বর্তমান সময়ের শুটিংয়ের সুবিধাও কম নয়। আগে যেখানে একটি নাটক বানাতে দীর্ঘ সময় লাগত, এখন অল্প সময়ে বেশি কাজ করা সম্ভব হচ্ছে। নতুন মুখের সুযোগ বাড়ছে, গল্পের বিষয়বস্তুর পরিসরও বিস্তৃত হয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কারণে নাটক আর শুধু টিভির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তা পৌঁছে যাচ্ছে নানা বয়সি ও ভিন্ন রুচির দর্শকের কাছে।
এখন অনেকে প্রশ্ন করছেন, এ গতি কি নাটকের মান ধরে রাখতে পারছে? অতীতের নাটকগুলো আজও স্মৃতিতে থেকে যায় কারণ সেগুলোতে ছিল সময়ের ছাপ, অভিনয়ের গভীরতা আর যত্নের ছোঁয়া। বর্তমানের নাটকগুলো অনেক সময় দ্রুত আলোচনায় আসে, আবার দ্রুতই হারিয়ে যায়। পার্থক্যটা তাই শুধু প্রযুক্তি বা বাজেটের নয়, পার্থক্যটা মূলত মানসিকতার।

সিনিয়র শিল্পীদের মতে, অতীতের নাটকের শুটিং ছিল একটি সৃজনশীল যাত্রা, যেখানে সবাই ধীরে ধীরে গন্তব্যে পৌঁছাত। বর্তমানের শুটিং অনেক বেশি দৌড়ঝাঁপের। এ দুই সময়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নাটক আজ এক সন্ধিক্ষণে।
প্রবীণ অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে অভিনেত্রী দিলারা জামান এখনো নিয়মিত কাজ করেন। বলা যায় তিন প্রজন্মের সঙ্গেই তার কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। অতীত ও বর্তমান শুটিংয়ের মধ্যে পার্থক্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘একটা সময় শুটিং মানে ছিল ধৈর্য। রিহার্সাল ছাড়া শুটিং করা একেবারেই ভাবা যেত না। এখন সবাই দ্রুত টেক নিয়ে এগোতে চায়, অভিনয়ের গভীরতা অনেকটাই হারাচ্ছে। নতুনরা সুযোগ পাচ্ছে, এটা ভালো, কিন্তু শৃঙ্খলা হারানো যাবে না। আগে শুটিং সেটে আমরা যারা সিনিয়ররা থাকতাম, আমরা কাজের পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আড্ডা দিতাম। অভিজ্ঞতা শেয়ার করতাম। এতে করে নতুন যারা ছিল তারাও শিখতে পারত। কোনো তাড়াহুড়া ছিল না। শুটিং সেটই ছিল তখন শেখার জায়গা। সিনিয়ররা তরুণদের অভিনয় শেখাতেন। এখন দ্রুততার কারণে শুধু দৃশ্য শেষ করাই মূল লক্ষ্য হয়ে গেছে। চরিত্রের জীবন বোঝা যেন অনেকটাই হারিয়ে গেছে।’

প্রবীণ আরেক অভিনেতা আবুল হায়াত। সিনিয়রদের মধ্যে তিনি এখনো নিয়মিত কাজ করছেন। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে বেশ দাপটের সঙ্গেই নিজের অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘শুটিং এখন বাজেট আর সময়ের হিসাব। প্রতিটি মিনিট কার্যকর করতে হয়। কিন্তু আগে আমরা শুটিংয়ের প্রতিটি মুহূর্তকে অনুভব করতাম। আলাপচারিতা, গল্প বোঝা, সবই নাটককে জীবন্ত করত। এখন তা অনেকটাই হারিয়ে গেছে। এটা ঠিক যে, প্রযুক্তি নতুন সুযোগ দিয়েছে, কিন্তু দ্রুত শুটিং মানে সবাই স্ট্রেসে। এক সময় আমরা গল্পের ছাপ অনুভব করতাম। এখন ক্যামেরা চলছে, সবাই দৌড়াচ্ছে। অভিনয়ের আনন্দ কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে, এটাই এখন সবচেয়ে দুঃখের বিষয়।’

 

মাহমুদ সালেহীন খান