ডুমসডে ক্লক এখন মধ্যরাতের ৮৫ সেকেন্ড আগে

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে মঙ্গলবার আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ২০২৬ সালের ডুমসডে ক্লক উন্মোচন করেন বুলেটিন অব দ্য অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টসের (বাম থেকে) জন বি. উলফস্টাল, আশা এম. জর্জ ও স্টিভ ফেটার। ছবি: পাবলো মার্টিনেজ মনসিভাইস / এপি

পরমাণু যুগের সূচনালগ্নে মানবজাতি পৃথিবী ধ্বংসের কতটা কাছাকাছি তা প্রতীকীভাবে বোঝাতে বিজ্ঞানীরা তৈরি করেছিলেন ‘ডুমসডে ক্লক’। প্রায় আট দশক পর এবার সেই ঘড়ির কাঁটা ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থানে পৌঁছেছে।

মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের অলাভজনক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বুলেটিন অব দ্য অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টস ঘোষণা করেছে, ২০২৬ সালের জন্য ডুমসডে ক্লক নির্ধারণ করা হয়েছে মধ্যরাতের মাত্র ৮৫ সেকেন্ড আগে। ১৯৪৭ সালে ঘড়িটি চালুর পর এটিই মধ্যরাতের সবচেয়ে কাছাকাছি সময়। মধ্যরাত মানবসভ্যতার সম্পূর্ণ ধ্বংস বা পৃথিবী মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ার প্রতীক।

ওয়াশিংটন ডিসিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডুমসডে ক্লক উন্মোচন করেন বুলেটিনের বিজ্ঞান ও নিরাপত্তা বোর্ডের সদস্যরা।

গত বছর এই ঘড়ি ছিল মধ্যরাতের ৮৯ সেকেন্ড আগে। তার আগের দুই বছর, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৯০ সেকেন্ডে। তবে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় পর্যাপ্ত অগ্রগতি না হওয়ায় এবার সময় আরও এগিয়ে আনা হয়েছে।

কেন এগোল ঘড়ির কাঁটা?

বুলেটিনের বিজ্ঞানীদের মতে, পারমাণবিক অস্ত্রের ঝুঁকি, জলবায়ু সংকট, জৈবিক হুমকি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মতো ‘বিঘ্ন সৃষ্টিকারী প্রযুক্তির’ অনিয়ন্ত্রিত অগ্রগতি মানবজাতির জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে উঠছে। পাশাপাশি ভুয়া তথ্য, অপতথ্য ও ষড়যন্ত্রমূলক তত্ত্বের বিস্তারও বড় ধরনের অস্তিত্বগত ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বুলেটিনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলেকজান্দ্রা বেল বলেন,
“মানবজাতিকে হুমকির মুখে ফেলা অস্তিত্বগত ঝুঁকিগুলো মোকাবিলায় আমরা পর্যাপ্ত অগ্রগতি করতে পারিনি। এই ঘড়ি আমাদেরই তৈরি প্রযুক্তির মাধ্যমে পৃথিবী ধ্বংসের কতটা কাছাকাছি আমরা তা জানানোর একটি মাধ্যম। প্রতিটি সেকেন্ড গুরুত্বপূর্ণ, এবং সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।”

পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়ছে

বুলেটিনের বিজ্ঞান ও নিরাপত্তা বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. ড্যানিয়েল হোল্‌জ বলেন, ২০২৫ সালে পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলোর মধ্যে একাধিক সামরিক সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে।

তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র মজুত নিয়ন্ত্রণে থাকা শেষ চুক্তিটি আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি মেয়াদ শেষ করবে। এর ফলে অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো বিশ্ব কার্যত কোনো অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ কাঠামো ছাড়াই দাঁড়িয়ে থাকবে, যা একটি নিয়ন্ত্রণহীন পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার আশঙ্কা তৈরি করছে।

জৈবিক ও প্রযুক্তিগত হুমকি

ড. হোল্‌জ আরও বলেন, জীবনবিজ্ঞান খাতে ‘সিনথেটিক মিরর লাইফ’-এর মতো নতুন গবেষণা ক্ষেত্র বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। এসব সম্ভাব্য জৈবিক বিপর্যয় মোকাবিলায় আন্তর্জাতিকভাবে কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা নেই।

এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার ও পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণের অভাব অপতথ্য ছড়ানোকে আরও সহজ করছে, যা পারমাণবিক যুদ্ধ, জলবায়ু সংকট ও জীবাণুজনিত বিপর্যয় মোকাবিলার প্রচেষ্টাকেও দুর্বল করে দিচ্ছে।

কী এই ডুমসডে ক্লক?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পারমাণবিক বোমা তৈরির গোপন প্রকল্প ‘ম্যানহাটন প্রজেক্ট’-এ কাজ করা একদল বিজ্ঞানী ১৯৪৫ সালে বুলেটিন অব দ্য অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টস প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে পারমাণবিক হুমকি মূল্যায়নই ছিল তাদের উদ্দেশ্য।

২০০৭ সাল থেকে জলবায়ু সংকটকেও হিসাবের মধ্যে আনা হয়। প্রতিবছর বিজ্ঞান ও নিরাপত্তা বোর্ড এবং নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানীদের সমন্বয়ে গঠিত স্পন্সর বোর্ডের পরামর্শে ঘড়ির সময় নির্ধারণ করা হয়।

ঘড়িটি কি বাস্তব কোনো পরিমাপক?

ডুমসডে ক্লক সরাসরি কোনো বৈজ্ঞানিক মাপকাঠি নয়, বরং এটি একটি প্রতীকী সতর্কবার্তা। অনেক বিশেষজ্ঞ একে ‘অসম্পূর্ণ রূপক’ বললেও, মানবজাতির অস্তিত্ব যে কতটা নাজুক তা মনে করিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।

মধ্যরাতে পৌঁছালে কী হবে?

ডুমসডে ক্লক কখনো মধ্যরাতে পৌঁছায়নি। বুলেটিনের সাবেক প্রধান নির্বাহী র‍্যাচেল ব্রনসন বলেন,
“মধ্যরাত মানে হয়তো পারমাণবিক যুদ্ধ বা ভয়াবহ জলবায়ু বিপর্যয়, যা মানবসভ্যতাকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে। আমরা কেউই সেখানে পৌঁছাতে চাই না।”

সময় কি আবার পিছিয়ে নেওয়া সম্ভব?

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এখনো সময় ঘুরিয়ে দেওয়ার সুযোগ আছে। ১৯৯১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র হ্রাস চুক্তি সই হওয়ার পর ঘড়ি সবচেয়ে দূরে গিয়েছিল মধ্যরাতের ১৭ মিনিট আগে।

ব্যক্তিগত পর্যায়েও ভূমিকা রাখা সম্ভব বলে মনে করেন তারা। জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় দৈনন্দিন জীবনে ছোট পরিবর্তন, তথ্যভিত্তিক আলোচনা এবং অপতথ্যের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি গুরুত্বপূর্ণ।

ফিলিপাইনের সংবাদমাধ্যম র‍্যাপলারের সহপ্রতিষ্ঠাতা মারিয়া রেসা বলেন, “তথ্য ছাড়া সত্য নেই, সত্য ছাড়া বিশ্বাস নেই। আর এই তিনটি ছাড়া কোনো যৌথ বাস্তবতা বা গণতন্ত্র সম্ভব নয়।”

সূত্র: সিএনএন

সাবরিনা রিমি/