jকাজের খোঁজে রাশিয়ায় গিয়ে ভয়ংকর ফাঁদে পড়ছে রাশিয়া। চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশি কর্মীদের জোরপূর্বক ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানো হয় বলে উঠে এসেছে একটি আন্তর্জাতিক তদন্তে। দীর্ঘ প্রায় চার বছর ধরে চলমান এই যুদ্ধে অধিক বেতনের লোভ দেখিয়ে সাধারণ শ্রমিকদের কীভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, সেই লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন ফিরে আসা ব্যক্তি এবং তাদের স্বজনরা।
মার্কিন গণমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপির) একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, জনশক্তি রপ্তানিকারক ও দালালরা রাশিয়ার বিভিন্ন বেসামরিক প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে কাজ দেওয়ার নাম করে বাংলাদেশিদের দেশটিতে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের সামনে আসছে এক ভিন্ন বাস্তবতা।
এক বাংলাদেশি শ্রমিকের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে জানানো হয়, তাকে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চাকরির কথা বলে রাশিয়ায় নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মস্কোয় নামার কিছুদিনের মধ্যেই তাকে ও তার সাথে থাকা অন্যান্য বাংলাদেশিদের বেশ কিছু রুশ নথিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। পরে জানা যায়, সেগুলো ছিল আসলে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগদানের চুক্তিপত্র। প্রতিবাদ জানালে বা কাজ করতে অস্বীকার করলে শুরু হতো অমানবিক নির্যাতন। একপর্যায়ে তাদের একটি সামরিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে ড্রোন পরিচালনা থেকে শুরু করে ভারী অস্ত্র চালনা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে আহতদের সরিয়ে নেওয়ার মতো বিপজ্জনক কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
ওই বাংলাদেশি যখন তার এজেন্টের দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা রুশ কমান্ডারের কাছে তুলে ধরেন, তখন সেই কমান্ডার একটি অনুবাদ অ্যাপের মাধ্যমে অত্যন্ত কর্কশ ভাষায় জানান, তাদের এজেন্ট তাদের রাশিয়ার কাছে বিক্রি করে দিয়েছে এবং এখন থেকে তারা রাশিয়ার সম্পত্তি।
এই অমানবিক প্রক্রিয়ার শিকার হয়েছেন আরও অনেক বাংলাদেশি। আরেকজন বাংলাদেশিকে ইলেকট্রিশিয়ান রাশিয়ায় গিয়েছিলেন একটি গ্যাস প্ল্যান্টে কাজ করতে। কিন্তু সেখানে প্রতিকূল আবহাওয়া আর কঠোর পরিশ্রমের চাপে পড়ে তিনি অনলাইনে নতুন কাজ খুঁজতে থাকেন। তখন একজন রুশ রিক্রুটার তাকে প্রলুব্ধ করে বলেন, তার ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে যে দক্ষতা আছে, তা যুদ্ধের ময়দানে নয় বরং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ইউনিটে কাজে লাগানো হবে। যুদ্ধের ময়দানে সরাসরি লড়তে হবে না। এমন মিথ্যা আশ্বাসে তিনি চুক্তিতে সই করেন।
তবে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তাকে যখন ইউক্রেনের যুদ্ধবিধ্বস্ত আভদিভকা শহরে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন তিনি বুঝতে পারেন তাকে প্রতারণা করা হয়েছে। ইউনিটের কমান্ডার তাকে সরাসরি জানিয়ে দেন, তাকে ধোঁকা দেওয়া হয়েছে এবং এখানে চুক্তিবদ্ধ সৈনিক হিসেবে যুদ্ধ করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। নির্দেশ পালনে সামান্য ভুল হলে বা অসম্মতি জানালে বেলচা দিয়ে পেটানো, হাতকড়া পরিয়ে রাখা এবং সংকীর্ণ বেসমেন্টে আটকে রেখে নির্যাতনের মতো ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে।
নিখোঁজ থাকা স্বজনদের পরিবারগুলো এখন চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। লক্ষ্মীপুরের এক তরুণকে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার পর তিনি প্রাণ হারিয়েছেন বলে তার পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। আবার ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে লন্ড্রি অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে কাজ করতে যাওয়া একজনের স্ত্রী জানান, তার স্বামী তাকে ফোনে জানিয়েছিলেন যে তাকে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। তার স্বামীর শেষ বার্তা ছিল কেবল তার পরিবারের কাছে দোয়া চাওয়া। তিনি জানিয়েছিলেন, তারা যদি যুদ্ধ করতে না যায় তবে রুশ সেনারা তাদের খাবার বন্ধ করে দেওয়ার বা গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। এই অসহায় শ্রমিকরা যখন বুঝতে পারছেন তারা জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন, তখন তাদের পেছনে ফেরার সব পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, কেবল বাংলাদেশ নয় বরং ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, কেনিয়া এবং ইরাকের মতো বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশের নাগরিকদেরও একইভাবে প্রতারণার জালে ফেলে রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে নামানো হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দালালরা পরিবারকে আশ্বস্ত করে বলে, রাশিয়ার আইন অনুযায়ী যেকোনো চাকরির জন্যই সাধারণ সামরিক প্রশিক্ষণ নেওয়া বাধ্যতামূলক। এই সরল বিশ্বাসে সাধারণ মানুষ বুক বেঁধেছিলেন উন্নত জীবনের আশায়, কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
-সাইমুন










