ডিপিডিসির ৩ প্রকল্পে ২২ হাজার কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ

হাসান মাহমুদ রিপন : 

ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিতে (ডিপিডিসি) নজিরবিহীন দুর্নীতি, অনিয়ম ও অর্থপাচারের অভিযোগ উঠেছে। তিন-তিনটি মেগা প্রকল্পে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকার লোপাটের অভিযোগে তদন্তে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ফাঁস হয়ে যাচ্ছে কীভাবে রাজনৈতিক প্রভাব, আমলাতান্ত্রিক সখ্য এবং অযোগ্য কর্মকর্তাদের সিন্ডিকেট মিলে একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দেউলিয়ার পথে ঠেলে দিয়েছে। এরইমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে কীভাবে দুর্নীতির মাধ্যমে একটি চক্র প্রকল্পের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেছে। ইতোমধ্যেই এই ঘটনায় ডিপিডিসির ভেতরে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। এমনকি ফেঁসে যাওয়ার ভয়ে অনেক বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা দেশ ছাড়ার পাঁয়তারা করছেন বলে জানা গেছে।
ইতোমধ্যেই দুদকের উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি দল এই দুর্নীতির অনুসন্ধান করেছে। গত ৫ মে দুদক থেকে ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠি দিয়ে তিনটি প্রকল্পের যাবতীয় নথিপত্র তলব করা হয়েছে। প্রকল্প তিনটি হলো: পিডিএসডি প্রকল্প (বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্প), স্মার্ট মিটার ও উন্নত মিটারিং অবকাঠামো প্রকল্প, জিটুজি প্রকল্প (বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্প)।
দুদকের উপ-পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, জিটুজি প্রকল্পে রাজনৈতিক প্রভাব, আমলাতান্ত্রিক যোগসাজশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির মাধ্যমে জনস্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে লুটপাট করা হয়েছে জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা। প্রকল্পে সবচেয়ে বড় জালিয়াতি হয়েছে মালামাল আমদানিতে। ইপিসি (ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড কন্সট্রাকশন) চুক্তি অনুযায়ী, অত্যন্ত সংবেদনশীল বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম যেমনÑ ১৩২ কেভি ক্যাবল এবং আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি জার্মানি বা ইউরোপের দেশগুলো থেকে আনার কথা ছিল। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে এসব মালামাল চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে জার্মানি বা ইউরোপের দেশগুলো থেকে ক্রয় না করে চীন থেকে নেওয়া হয়েছে।
দুদকের প্রাথমিক তদন্তে রিপোর্টে বলা হয়েছে, সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস, আবুল কালাম আজাদ এবং ডিপিডিসির জিটুজি প্রকল্পের বর্তমান প্রকল্প পরিচালক ফজিলাতুন্নেসাসহ সংস্থাটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এই বিশাল অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, ইউরোপের (জার্মানি/পোল্যান্ড) নামী ব্র্যান্ডের যন্ত্রপাতি সরবরাহের কথা বলে দরপত্র চূড়ান্ত করা হলেও বাস্তবে চীন থেকে অত্যন্ত নিম্নমানের এবং সস্তা যন্ত্রপাতি আনা হয়েছে। অথচ ডিপিডিসি থেকে বিল তুলে নেওয়া হয়েছে ইউরোপীয় উচ্চমূল্যে। এই বিশাল অংকের পার্থক্যই হুণ্ডির মাধ্যমে দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করা হয়েছে বলে রিপোর্টে প্রকাশ।
জানা যায়, জিটুজি প্রকল্পটি শুরুতে ‘ডেসকো’কে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন নসরুল হামিদ বিপু। কিন্তু ডেসকো কর্তৃপক্ষ টেকনিক্যাল ও অর্থনৈতিক দিক বিবেচনা করে এটি প্রত্যাখ্যান করলে তা জোরপূর্বক ডিপিডিসির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। সাধারণ প্রকৌশলীদের মতে, বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই প্রকল্প ছিল উচ্চাভিলাষী এবং অপ্রয়োজনীয়। শুধু কমিশন বাণিজ্যের জন্যই এটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, তদন্ত পরবর্তী সময়ে দুদকের গোয়েন্দা নজরদারিতে থাকা ব্যক্তিদের তালিকায় রয়েছেন সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস, আবুল কালাম আজাদ, ডিপিডিসির জিটুজি প্রকল্পের সাবেক ও বর্তমান পিডি, সাবেক দুই এমডি এবং একাধিক প্রভাবশালী প্রকৌশলী।
এদিকে, জিটুজি প্রকল্পে মহাদুর্নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে যার নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে, তিনি হলেন জিটুজি প্রকল্পের পরিচালক ও প্রধান প্রকৌশলী ফজিলাতুন্নেছা। তার নিয়োগ থেকে শুরু করে পদোন্নতিÑ সবই যেন রূপকথার গল্প।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প পরিচালক (পিডি) প্রকৌশলী ফজিলাতুন্নেছার নিয়োগের শুরুতে যথাযথ যোগ্যতা না থাকায় তার জীবনবৃত্তান্ত (সিভি) ফেলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন এমডি আতাউল মাসুদের বিশেষ আনুকূল্যে তিনি চাকরি পান।
পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউসের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে তিনি ডিপিডিসিতে অঘোষিত সম্রাজ্ঞী হয়ে ওঠেন। এমনকি তার দাপটে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ডিঙিয়ে ফজিলাতুন্নেছাকে প্রধান প্রকৌশলী করা হয়। অভিযোগে প্রকাশ, প্রকল্পের ঠিকাদারের টাকায় তিনি সপরিবারে কয়েকবার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। এমনকি তৎকালীন সময়ে বুয়েটের অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী যখন এই প্রকল্পের ব্যয় ও পণ্যের মান নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন, তখন তাকে বাদ দিয়ে আহমদ কায়কাউস নতুন পকেট কমিটি গঠন করেছিলেন।
এদিকে, ২০২৩ সালে বিদ্যুৎ বিভাগীয় একটি তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১৩২ কেভি ক্যাবল ও আনুষঙ্গিক মালামাল জার্মানির পরিবর্তে চীন থেকে শিপমেন্ট করা হয়েছে। পিএলআই (পোস্ট ল্যান্ডিং ইন্সপেকশন) কমিটি সরাসরি এই মালামাল গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালেও ফজিলাতুন্নেছা নিজের প্রভাব খাটিয়ে অন্য একটি কমিটির মাধ্যমে তা অনুমোদন করিয়ে নেন।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের মালামাল ইউরোপের তুলনায় ২০-৩০ ভাগ সস্তা। আর তাই শুধু মালামাল পরিবর্তনের মাধ্যমেই সরকারের কয়েকশ কোটি টাকা গচ্চা গেছে। এমনকি প্রকল্পের মালামাল কেনা হলেও তার একটি বড় অংশ বাস্তবে ব্যবহার হয়নি। এছাড়া কোটি কোটি টাকার ক্যাবল চুরির সঙ্গেও প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের কারও কারও যোগসাজশ ছিল। তদন্তে প্রকল্পের দুর্নীতির সঙ্গে প্রাথমিকভাবে জড়িতের সন্দেহে ডিপিডিসির ১৪ কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হয়। এ তালিকায় জিটুজি প্রকল্পের বর্তমান পিডি ফজিলাতুন্নেসাসহ প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও নির্বাহী প্রকৌশলীরা রয়েছেন বলে জানা যায়।
ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বিএম মিজানুল হাসান বলেন, ‘আমি সম্প্রতি সংস্থায় যোগদান করেছি। ফলে আমি এসব বিষয়ে এখনো অবগত নই। তবে আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন। অনিয়ম-দুর্নীতিতে ডিপিডিসির যে বা যারাই জড়িত থাকুন না কেন প্রমাণসাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে, দুদকের সাঁড়াশি অভিযান এবং গোয়েন্দা নজরদারির খবর ছড়িয়ে পড়তেই ডিপিডিসিতে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। প্রকল্পের দুর্নীতিতে জড়িত সংশ্লিষ্ট বর্তমান ও সাবেক অনেক কর্মকর্তা ইতোমধ্যেই দেশত্যাগের চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে। দুদকের চিঠির পর তথ্য গোপনের চেষ্টাও চলেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এটি বিদ্যুৎ খাতের আরেকটি ভয়াবহ কেলেঙ্কারি। প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে বারবার এমন লুটপাটের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।’ তিনি বলেন, শুধু বিভাগীয় ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়, ফৌজদারি আইনে তাদের বিচার হওয়া প্রয়োজন।
সাবেক দুদক চেয়ারম্যান ড. ইকবাল মাহমুদ বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া এমন গভীর স্তরের দুর্নীতি নির্মূল করা অসম্ভব। বিদ্যুৎ খাতের মতো স্পর্শকাতর জায়গায় যখন হাজার হাজার কোটি টাকার নয়-ছয় হয়, তখন তার প্রভাব সরাসরি সাধারণ জনগণের ওপর পড়ে।

সুশান্ত