ধানের ফলনে পিছিয়ে বাংলাদেশ: বৈজ্ঞানিক কারণ, ব্যবস্থাগত সীমাবদ্ধতা ও করণীয়

বাংলাদেশ ধানের দেশ। আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং কৃষকের জীবন-জীবিকা এই এক ফসলের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ধান উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের একটি বড় সাফল্য। তবু বাস্তবতা হলোÑ বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ধানের গড় ফলন এখনও কম। এই ব্যবধানের কারণ বুঝতে হলে আমাদের কৃষি ব্যবস্থার ভেতরের বৈজ্ঞানিক ও কাঠামোগত বাস্তবতাগুলো স্পষ্টভাবে দেখতে হবে।

সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে ধানের গড় ফলন প্রায় ৪ দশমিক ৮২ টন প্রতি হেক্টর। অথচ বিশ্বে উচ্চ ফলনশীল দেশগুলোতে এই ফলন ৬-১০ টনের অনেক ওপরে। এই ব্যবধানের একটি বড় কারণ হলো বাংলাদেশে হাইব্রিড ধানের বিস্তার অত্যন্ত ধীর। বর্তমানে দেশে মোট ধান আবাদ এলাকার মাত্র প্রায় ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ হাইব্রিড জাতের আওতায় রয়েছে। অথচ গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, যেখানে হাইব্রিড ধান চাষ হচ্ছে, সেখানে ধানের গড়  ফলন হেক্টর প্রতি ৬ দশমিক ৩ টন, যা দেশের সামগ্রিক গড় ফলন ৪ দশমিক ৮২ টন প্রতি হেক্টরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। অর্থাৎ, হাইব্রিড ধানের সীমিত গ্রহণযোগ্যতা ধানের গড় ফলন কমে যাওয়ার পেছনে একটি উল্লেখযোগ্য কারন।

বাংলাদেশে ধান উৎপাদন হয় তিনটি মৌসুমে-আউশ, আমন ও বোরো। এর মধ্যে বোরো মৌসুমে সেচ ও ইনপুট ব্যবস্থাপনা তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় গড় ফলন প্রায় ৬ দশমিক শূন্য টন প্রতি হেক্টর পর্যন্ত পৌঁছায়। কিন্তু আমন মৌসুমে, যা মূলত বৃষ্টিনির্ভর, গড় ফলন নেমে আসে প্রায় ৩ দশমিক ৯৪ টন প্রতি হেক্টরে। অর্থাৎ আমন মৌসুমের ফলন বোরোর তুলনায় প্রায় ৫২ শতাংশ কম। এই মৌসুমভিত্তিক বৈষম্যই জাতীয় গড় ফলনকে উল্লেখযোগ্যভাবে নিচে নামিয়ে রাখে।

ধানের ফলনে পিছিয়ে থাকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো ণরবষফ এধঢ়-গবেষণা খামার বা উন্নত ব্যবস্থাপনায় যে ফলন সম্ভব এবং কৃষকের মাঠে যে ফলন বাস্তবে পাওয়া যায়, তার মধ্যকার ব্যবধান। বাংলাদেশে এই ণরবষফ এধঢ় প্রায় ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এর মানে হলো, বিদ্যমান জাত ও প্রযুক্তি ব্যবহার করেই ফলন বাড়ানোর বড় সুযোগ রয়েছে, কিন্তু তা মাঠপর্যায়ে পুরোপুরি বাস্তবায়িত হচ্ছে না।

এই ণরবষফ এধঢ়-এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো ধীর যান্ত্রিকীকরণ। বাংলাদেশে জমি প্রস্তুতির ক্ষেত্রে যান্ত্রিকীকরণ অনেকাংশে হলেও, রোপণ ও কাটার মতো সময়সংবেদনশীল ধাপে যান্ত্রিকীকরণ এখনও সীমিত। সময়মতো রোপণ ও কাটাই না হওয়ায় ধান গাছ প্রায়ই প্রতিকূল আবহাওয়ার মুখে পড়েÑ যেমন অতিবৃষ্টি, তাপ-চাপ বা ঝড়Ñ ফলে ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ছোট ও খণ্ডিত জমির কারণে অধিকাংশ কৃষকের পক্ষে নিজস্ব যন্ত্র কেনা সম্ভব নয়, আবার সেবাভিত্তিক যন্ত্রপ্রাপ্যতাও এখনও পর্যাপ্ত নয়। এর ফলে সময়ানুবর্তিতা ব্যাহত হয় এবং ফলনের সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যায়।

পোস্ট-হারভেস্ট ক্ষতিও ধানের কার্যকর ফলন কমিয়ে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ধানে ৮-১৫ শতাংশ পর্যন্ত পোস্ট-হারভেস্ট লস ঘটে, যা কাটাই, মাড়াই, শুকানো ও সংরক্ষণের বিভিন্ন ধাপে হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেরিতে কাটার কারণে ধান ঝরে পড়ে বা অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে দানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উচ্চ ফলনশীল দেশগুলোতে যেখানে এই ক্ষতি ৩-৫ শতাংশের মধ্যে সীমিত, সেখানে বাংলাদেশে এই ক্ষতি জাতীয় উৎপাদনের একটি বড় অংশকে অদৃশ্যভাবে কমিয়ে দেয়।

ধানের ফলনে ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত আরও কিছু বিষয় সরাসরি প্রভাব ফেলে। সার ব্যবস্থাপনা এখনও অনেক ক্ষেত্রে অনুমাননির্ভর, মাটির পরীক্ষাভিত্তিক নয়। ফলে নাইট্রোজেনের অপচয় হয় এবং পুষ্টি দক্ষতা কমে যায়। একইভাবে চারা বয়স একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অতিরিক্ত বয়সের চারা রোপণ করলে টিলার সংখ্যা কমে যায় এবং ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। আগাছা ব্যবস্থাপনা, রোপণের সময় এবং রোপণের সঠিক দূরত্ব ও পদ্ধতিÑএই প্রতিটি ধাপেই সামান্য বিচ্যুতি ধানের ফলনে বড় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

এই প্রেক্ষাপটে ধানের ফলন বাড়াতে প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো জেনেটিক্স ও বীজ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা। অঞ্চলভিত্তিক উচ্চ ফলনশীল ও স্ট্রেস-সহনশীল জাত নির্বাচন করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী চাহিদাভিত্তিক বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। বীজের মান নিয়ন্ত্রণ এবং সময়মতো প্রাপ্যতা ধানের ফলনের ভিত্তি তৈরি করে। উন্নত জাত মাঠে পৌঁছাতে দেরি হলে বা মান ঠিক না থাকলে অন্য সব ব্যবস্থাপনার সুফলও হারিয়ে যায়। সবকিছু মিলিয়ে স্পষ্ট হয় যে বাংলাদেশের ধানের কম ফলন কোনো একক সমস্যার ফল নয়। এটি হাইব্রিড ধানের ধীর বিস্তার, মৌসুমভিত্তিক বৈষম্য, ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত একাধিক ঘাটতি ধীর যান্ত্রিকীকরণ, পোস্ট-হারভেস্ট ক্ষতি, ণরবষফ এধঢ়, মৌসুমভিত্তিক বৈষম্য এবং জেনেটিক্স ও বীজ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার সম্মিলিত ফল। তাই সমাধানও হতে হবে সমন্বিত।

যদি আমরা জেনেটিক্স ও বীজ ব্যবস্থা শক্তিশালী করি, সময়সংবেদনশীল ধাপে সেবাভিত্তিক যান্ত্রিকীকরণ সম্প্রসারণ করি, পোস্ট-হারভেস্ট ব্যবস্থাপনা উন্নত করি এবং মাঠপর্যায়ে প্রিসিশন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারিÑতাহলে স্বল্পমেয়াদেই দেশের গড় ধান ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। মধ্যমেয়াদে বাংলাদেশের পক্ষে ধানের গড় ফলন ৭ টন প্রতি হেক্টরের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া একটি বাস্তব ও বৈজ্ঞানিকভাবে অর্জনযোগ্য লক্ষ্য।

শেষ পর্যন্ত বলা যায়, বাংলাদেশ ধানের ফলনে পিছিয়ে আছে অক্ষমতার কারণে নয়, বরং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে। বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, সময়োপযোগী নীতি সহায়তা এবং কৃষককেন্দ্রিক সেবা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ ধানের ফলনে অবশ্যই নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারবে।

লেখক: গ্রুপ অ্যাডভাইজার, এসিআই পিএলসি এবং প্রেসিডেন্ট, এসিআই এগ্রিবিজনেস।

ড. এফ এইচ আনসারী