নির্বাচনী দামামা বাজার সাথে সাথেই দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন মেরুকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজপথের আন্দোলনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলা বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার দীর্ঘদিনের মিত্রতায় বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণার শুরুতেই দুই দলের নেতা-কর্মীদের রাজপথে মুখোমুখি অবস্থান এবং পাল্টাপাল্টি শোডাউন রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন উত্তাপ সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ক্ষমতার সমীকরণ এবং আসন বণ্টন নিয়ে তৈরি হওয়া এই দূরত্ব এখন আর কেবল আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা মাঠপর্যায়ে সংঘাতে রূপ নিচ্ছে।
শীর্ষ নেতাদের বাগ্যুদ্ধ: আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণ
প্রচারণার দ্বিতীয় দিনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভার্চুয়ালি বিভিন্ন জনসভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় জামায়াতের নাম না নিলেও অত্যন্ত কঠোর ভাষায় তাদের সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, “রাজনীতিতে ধর্মের অপব্যবহার করে যারা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চায়, তারা আসলে স্বৈরাচারের অন্য রূপ। ধর্মকে পুঁজি করে যারা বেহেশতের টিকিট বিলি করে, তাদের হাত থেকে গণতন্ত্র নিরাপদ নয়।” তারেক রহমান ভোটারদের সতর্ক করে দিয়ে আরও বলেন, একটি বিশেষ গোষ্ঠী ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভোটারদের তথ্য সংগ্রহ করে নির্বাচনী কারচুপির ছক আঁকছে, যা যেকোনো মূল্যে রুখে দিতে হবে।
পাল্টা জবাবে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, “কারো কারো আচরণে মনে হচ্ছে তারা দেশটাকে নিজেদের পৈতৃক সম্পত্তি মনে করছে। ফ্যাসিবাদের পতন হলেও নতুন কোনো ফ্যাসিবাদকে দেশের মানুষ গ্রহণ করবে না।” জামায়াত নেতারা অভিযোগ করছেন, বিএনপি বড় দল হিসেবে ছোট দলগুলোকে কোণঠাসা করার যে নীতি নিয়েছে, তা গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়।
বিরোধের মূলে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ ও ‘তথ্য সংগ্রহ’
নির্বাচনী কৌশলের অংশ হিসেবে বিএনপির পক্ষ থেকে জামায়াতের বিরুদ্ধে এক নতুন অভিযোগ তোলা হয়েছে। তারেক রহমান তাঁর একাধিক বক্তব্যে দাবি করেছেন, একটি বিশেষ মহল ভোটারদের এনআইডি ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ করার ছক আঁকছে। যদিও জামায়াত এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, তারা কেবল তাদের নিজস্ব সদস্য ও সমর্থকদের ডাটাবেজ আপডেট করছে।
রাজপথ ছাড়িয়ে এখন সংঘাতের পথে
প্রচারণার প্রথম দিন থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলায় বিএনপি ও জামায়াতের নেতা-কর্মীরা সংঘাতের জড়িয়ে পড়েছেন।
লক্ষ্মীপুর ও ভোলা: লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) আসনে ফেস্টুন লাগানোকে কেন্দ্র করে দুই দলের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ৪ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, ভোলার চরফ্যাশনে জামায়াতের গণসংযোগে হামলার অভিযোগ উঠেছে বিএনপির বিরুদ্ধে, যেখানে অন্তত ১২ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
রাজধানীর মাঠ: ঢাকার মিরপুর ও ভাষানটেক এলাকায় প্রচারণা চালানোর সময় দুই দলের সমর্থকরা একে অপরের মুখোমুখি হলে পুলিশি হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
রাজশাহী ও বগুড়া: জামায়াতের দুর্গ হিসেবে পরিচিত আসনগুলোতে বিএনপির পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা এবং মাইকিংয়ে বাধা দেওয়ার ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চট্টগ্রাম: উত্তর চট্টগ্রামে জামায়াত-বিএনপি কর্মীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনায় এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
কুমিল্লার সংঘাত: এছাড়াও বিএনপির সঙে স্বতন্ত্র মাঠপর্যায়ে প্রচারণাকে কেন্দ্র করে কুমিল্লায় বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে বিএনপির প্রার্থীর সমর্থকরা একজন শক্তিশালী স্বতন্ত্র প্রার্থীর (সাবেক বিএনপি নেতা ও জামায়াত সমর্থিত) মিছিলে লাঠিসোটা নিয়ে হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন এবং বেশ কয়েকটি নির্বাচনী ক্যাম্প ভাঙচুর করা হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, ওই আসনে স্বতন্ত্র ও জামায়াতের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা দেখে আতঙ্কিত হয়েই এই হামলা চালিয়েছে বিএনপির কর্মীরা।
আসন ভাগাভাগি ও শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই উত্তাপের মূলে রয়েছে ‘আসন বণ্টন’ নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা। বিএনপি এবার তাদের একক শক্তিতে সরকার গঠনের স্বপ্ন দেখছে, ফলে তারা জামায়াতকে খুব বেশি আসন ছেড়ে দিতে ইচ্ছুক নয়। অন্যদিকে, জামায়াত নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং সাংগঠনিক শক্তি প্রমাণ করতে অন্তত ৫০-৬০টি আসনে ছাড় দিতে নারাজ।
অন্য দিকে বিএনপির এক সিনিয়র নেতা বলেন, “আমাদের লক্ষ্য বৃহত্তর ঐক্য, কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে জামায়াতের অতি তৎপরতা অনেক সময় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। আমরা পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করছি।”
গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা শঙ্কা
প্রচারণার শুরুতে দুই পক্ষের এই মুখোমুখি অবস্থান প্রশাসনের জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, যদি কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে দ্রুত কোনো সমঝোতা না হয়, তবে প্রচারণার দ্বিতীয় সপ্তাহে এই বিরোধ সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে মফস্বল শহরগুলোতে দুই দলের ক্যাডার ভিত্তিক রাজনীতি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে।
বিশ্লেষকদের শঙ্কা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবারের নির্বাচন বিএনপি বনাম জামায়াতের শক্ত লড়াইয়ে পরিণত হচ্ছে। বিএনপি ও জামায়াতের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের অবসান ঘটিয়ে দা-কুমড়া সম্পর্ক কেবল নির্বাচনী প্রচারণাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এই বৈরিতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রের দখল এবং ভোটের ফলাফলকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে। দুই দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যদি দ্রুত সমঝোতায় না পৌঁছায়, তবে এই ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
এছাড়াও এবারের পরিস্থিতি আগের নির্বাচনগুলোর চেয়ে ভিন্ন। বিএনপি এখন অনেক বেশি কৌশলী এবং আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের ইমেজ বজায় রাখতে জামায়াতের সঙ্গে দৃশ্যত দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছে। অপরদিকে, জামায়াত নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় এবং সাংগঠনিক শক্তি জানান দিতে রাজপথে এককভাবে সক্রিয় হওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে। এই দ্বিমুখী কৌশলই মাঠপর্যায়ে দুই দলের কর্মীদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছে।
ভোটারদের প্রতিক্রিয়া
সাধারণ ভোটাররা এই পরিস্থিতিকে দেখছেন ভিন্ন চোখে। সাভারের একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম তারা মিলেমিশে নির্বাচন করবে, কিন্তু এখন দেখছি নিজেদের মধ্যেই লড়াই। এতে সাধারণ মানুষের মনে ভয় ঢুকে যাচ্ছে।”
বিএনপি-জামায়াতের এই মুখোমুখি অবস্থান শেষ পর্যন্ত ভোটের বাক্সে কী প্রভাব ফেলে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে প্রচারণার শুরুতে এই উত্তাপ যদি প্রশমিত না হয়, তবে তার সরাসরি সুবিধা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ঘরে যেতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।