- রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবেই আটকে ছিল জাতীয় নগর নীতি
- আধুনিক ও সুশৃঙ্খল নগর কাঠামোর লক্ষ্যে নীতিমালা কার্যকর অপরিহার্য
- কার্যকর হলে নগর ব্যবস্থাপনা আইনি ও কৌশলগত ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে
- বিগত সরকার আমলে সংশোধন ও পরিমার্জন হলেও আলোর মুখ দেখেনি
বাংলাদেশের নগরায়ণকে একটি সুশৃঙ্খল ও সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনতে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ‘জাতীয় নগর নীতি ২০২৫’-এর খসড়া প্রায় চূড়ান্ত। এই নীতির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো ‘নগর সরকার’ ধারণার প্রতিফলন, যেখানে ওয়াসা, রাজউক, পিডিবি এবং পুলিশসহ জনসেবামূলক সব সংস্থা নগর কর্তৃপক্ষের (সিটি কর্পোরেশন) সরাসরি সমন্বয়ের অধীনে থাকবে। স্থানীয় সরকার বিভাগ শিগগিরই এই নীতিমালাটি চূড়ান্ত করবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছ।
কেন প্রয়োজন ‘নগর সরকার’?
বর্তমানে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণসহ বড় শহরগুলোতে সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের চরম অভাব লক্ষ্য করা যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন:
ক্ষমতাহীন মেয়র: বর্তমানে মেয়ররা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলেও রাজউক, ওয়াসা বা বিদ্যুৎ বিভাগের ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সংকটের সময় মেয়ররা কার্যত ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েন।
সমন্বয়হীন উন্নয়ন: রাস্তা কাটা, ড্রেনেজ সংস্কার বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংস্থা আলাদাভাবে কাজ করায় জনভোগান্তি বাড়ে।
বৈশ্বিক মডেল: উন্নত বিশ্বের প্রায় প্রতিটি আধুনিক শহরে ‘নগর সরকার’ ব্যবস্থা বিদ্যমান, যেখানে মেয়রের অধীনেই শহরের সব পরিষেবা পরিচালিত হয়।
নগরবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম জাতীয় নগর নীতির অনুমোদন নিয়ে দীর্ঘ ২০ বছরের অচলাবস্থায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি এই নীতিকে দ্রুত কার্যকর করার ওপর জোর দিয়ে অধ্যাপক নজরুল ইসলাম স্মরণ করিয়ে দেন যে, এই নগর নীতির যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালে। ২০১১ সালে তাঁর নেতৃত্বেই একটি উচ্চপর্যায়ের সেমিনারে খসড়াটি অনুমোদিত হয়। এরপর ২০১৪, ২০১৬ এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালে বিগত সরকারের আমলে একাধিকবার এটি সংশোধন ও পরিমার্জন করা হলেও তা কখনোই আলোর মুখ দেখেনি। তাঁর মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবেই এতদিন এটি আটকে ছিল।
তিনি বলেন, ‘২০১১ থেকে ২০২৬ সাল’ একটি অপরিহার্য নীতিমালার জন্য দেড় দশক অপেক্ষা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আর কত কাল এটি ফাইলবন্দি থাকবে? তার মতে, খসড়াটির বর্তমান রূপ সামগ্রিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং সামান্য কিছু ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা থাকলেও তা দ্রুত সংশোধন করে এখনই অনুমোদন দেওয়া সম্ভব।’
নগর উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হিসেবে ‘নগর নীতি’ দাবি করে তিনি বলেন, নগরায়নের বিশৃঙ্খলা রোধে এই নীতিমালা একটি মৌলিক সংস্কার হিসেবে কাজ করবে। অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন ‘একটি আধুনিক ও সুশৃঙ্খল নগর কাঠামোর জন্য এই নীতিমালা দ্রুত কার্যকর করা অপরিহার্য। এটি কেবল একটি দাপ্তরিক নথি নয়, বরং নগর উন্নয়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটানোর প্রধান হাতিয়ার।’
দৃঢ়ভাবে নীতি অনুমোদনের আবশ্যকতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক সংশোধন ও পরিমার্জন হয়েছে, এখন আর কালক্ষেপণ না করে দ্রুত চূড়ান্ত অনুমোদনের দিকে যাওয়া উচিত। তাঁর মতে, এটি কার্যকর হলে দেশের নগর ব্যবস্থাপনা একটি সুনির্দিষ্ট আইনি ও কৌশলগত ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে, যা দীর্ঘমেয়াদী সংস্কারের পথ প্রশস্ত করবে।
খসড়া নীতির মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ
জাতীয় নগর নীতির খসড়ায় জনসংখ্যা ও সক্ষমতার ভিত্তিতে দেশের শহরগুলোকে চারটি স্তরে বিন্যাস করা হয়েছে:
১. মেগাসিটি: ১ কোটি বা তার বেশি জনসংখ্যা (যেমন: ঢাকা)।
২. মহানগর/মেট্রোপলিটন সিটি: ৫ লাখ থেকে ১ কোটি জনসংখ্যা।
৩. মাঝারি শহর/জেলা শহর: ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ জনসংখ্যা।
৪. ছোট শহর/উপজেলা কেন্দ্র: ২০ থেকে ৫০ হাজার জনসংখ্যা।
প্রস্তাবিত উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কাঠামো
(ক) জাতীয় নগর উন্নয়ন কাউন্সিল: সরকারপ্রধানকে সভাপতি করে একটি উচ্চপর্যায়ের কাউন্সিল গঠন করা হবে। এতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, মেয়র এবং বিশেষজ্ঞদের প্রতিনিধিরা থাকবেন।
(খ) নগর উপদেষ্টা পরিষদ: কাউন্সিলকে কারিগরি ও নীতিগত সহায়তা দিতে একটি বিশেষজ্ঞ দল থাকবে।
(গ) পরিষেবা নিশ্চিতকরণ: পানি, স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাকে একটি ছাতার নিচে নিয়ে আসা।
(ঘ) জলবায়ু সহিষ্ণুতা: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় টেকসই নগর পরিকল্পনা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।
৪. বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ ও সংশয়
নীতিমালাটি দীর্ঘ সময় ঝুলে থাকার পর পুনরুজ্জীবিত হওয়ায় আশার আলো দেখছেন নগরবিদরা। তবে কিছু ক্ষেত্রে সমালোচনাও রয়েছে:
নগরবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘ ১৬ বছর পর এই নীতিমালার উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তবে এতে ‘নগর দর্শন’ নামে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য যুক্ত করা প্রয়োজন। এটি দ্রুত পাস হলে নগর উন্নয়নে বড় সংস্কার আসবে।’
অন্যদিকে, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সহ-সভাপতি স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ‘জনগণকে প্রকৃত অর্থে ক্ষমতায়িত করতে হলে নগর সরকারকে আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা দিতে হবে। শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে থেকে নগর শাসন অসম্ভব।’
সরকারের পরিকল্পনা ও বর্তমান অবস্থা
স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব কাজী আনোয়ার হোসেন (অ.দা.) জানান, ইতোমধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সাথে অংশীজন সভা সম্পন্ন হয়েছে। তিনি বলেন, ‘নীতিমালায় সরাসরি ‘নগর সরকার’ শব্দটি না থাকলেও এর অন্তর্নিহিত ভাবনায় সমন্বিত সেবার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। আমরা শিগগিরই আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষ করে এটি চূড়ান্ত করতে চাই।’
আগামীর চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণ
নীতিমালা বাস্তবায়নের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বিদ্যমান শক্তিশালী সংস্থাগুলোর (যেমন রাজউক বা ওয়াসা) ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা কেন্দ্রীয় শাসনের মানসিকতা পরিবর্তন করে স্থানীয় সরকারকে প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী করা না গেলে ‘নগর সরকার’ কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সংস্কারের যে জোয়ার তৈরি হয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে দ্রুত আইনগত ভেটিং সম্পন্ন করা গেলে বাংলাদেশের নগরায়ণ এক নতুন যুগে প্রবেশ করবে।
উল্লেখ্য, দেশের মোট জনসংখ্যার ৩২ শতাংশ শহরে বাস করলেও দেশজ উৎপাদনে(জিডিপি) তাদের অবদান ৬০ শতাংশের বেশি। এই বিপুল উৎপাদনশীলতাকে কাজে লাগাতে পরিকল্পিত নগরায়ণের বিকল্প নেই। ফলে ‘জাতীয় নগর নীতি ২০২৫’ পাস হলে তা বাংলাদেশের নগর ব্যবস্থাপনায় এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হবে।
-হাসান মাহমুদ রিপন










