আসন্ন রমজান, গ্রীষ্মকাল এবং সেচ মৌসুমকে সামনে রেখে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা গভীর সংকটের মুখে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) বিশাল অংকের বকেয়া পরিশোধে ব্যর্থতা এবং দেশি-বিদেশি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীরা চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দ্রুত সমাধান না হলে সেচ ও শিল্পোৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জনজীবনে চরম ভোগান্তি নেমে আসতে পারে।
বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা বকেয়া বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বিল পরিশোধ না হওয়ায় উদ্যোক্তারা জ্বালানি আমদানির জন্য নতুন ঋণপত্র (LC) খুলতে পারছেন না। অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র ইতিমধ্যে লিখিতভাবে জানিয়েছে যে, ব্যাংক ঋণের সুদ ও সরবরাহকারীদের পাওনা মেটাতে না পারায় তারা উৎপাদন চালিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছে। চুক্তির ধারা অনুযায়ী বিল পরিশোধে দীর্ঘস্থায়ী ব্যর্থতার ক্ষেত্রে উৎপাদন বন্ধ রাখার সুযোগ থাকলেও জাতীয় স্বার্থে কেন্দ্রগুলো সচল রাখা হয়েছে। তবে জ্বালানি সংকটে অনেক ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র যেকোনো সময় উৎপাদন সীমিত করতে বাধ্য হতে পারে।
বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসানাত অভিযোগ করেছেন, পিডিবি জরিমানা কর্তনের ক্ষেত্রে দ্বৈতনীতি অনুসরণ করছে। তাঁর দাবি, বিদেশি মালিকানাধীন কেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রে চুক্তির শর্ত শিথিল রাখা হলেও দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিল থেকে নিয়মিত বড় অংকের জরিমানা (LD) কেটে নেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পিডিবির বিল পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হলেও তার দায় চাপানো হচ্ছে উৎপাদকদের ওপর।
ফার্নেস অয়েলভিত্তিক প্রায় ৩০টি বিদ্যুৎকেন্দ্র জরিমানার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) সালিশ আবেদন করেছিল। বিইআরসি উভয় পক্ষকে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়ে সালিশ চলাকালীন জরিমানা কর্তন বন্ধ রাখার আদেশ দিয়েছিল। অভিযোগ উঠেছে, পিডিবি এই নির্দেশনা অমান্য করেই কিছু কেন্দ্রের পাওনা থেকে অর্থ কেটে নিয়েছে।
গতকাল বিদ্যুৎ ভবনে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে জানানো হয়েছে, এবারের সেচ মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। বর্তমান চাহিদা ও জোগানের ব্যবধান কমাতে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা বকেয়া পরিশোধের বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধুমাত্র অর্থ বরাদ্দই যথেষ্ট নয়; নীতিগত বৈষম্য দূর না করলে দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হবেন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, “বিদ্যুৎ খাত পুরোপুরি চুক্তিনির্ভর। বিল পরিশোধ না হওয়ার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হলে তার দায় উৎপাদকদের ওপর চাপানো যুক্তিসংগত নয়। দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে ভিন্ন আচরণ দীর্ঘমেয়াদে দেশের বিদ্যুৎ নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।”