দেশের বিচার ব্যবস্থায় আধুনিকায়ন ও বিচারপ্রার্থী জনগণের ভোগান্তি লাঘবে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। প্রচলিত বেইলবন্ড দাখিল পদ্ধতির পরিবর্তে ডিজিটাল মাধ্যমে ‘ই-বেইলবন্ড’ (e-Bail Bond) বা ডিজিটাল জামিননামা প্রবর্তনের নতুন এক অধ্যায় শুরু হলো। বুধবার (২১ জানুয়ারি) সকালে সচিবালয়ে আটটি জেলায় এই সেবার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল।
যে আট জেলায় নতুন সেবা চালু হলো
এর আগে পরীক্ষামূলকভাবে নারায়ণগঞ্জ জেলায় এই কার্যক্রম সফলভাবে শুরু হয়েছিল। আজ দ্বিতীয় ধাপে দেশের আরও আটটি জেলায় এই সেবা চালু করা হয়েছে। জেলাগুলো হলো: মানিকগঞ্জ, বান্দরবান, মেহেরপুর, জয়পুরহাট, মৌলভীবাজার, পঞ্চগড়, ঝালকাঠি, শেরপুর।
এক ঘণ্টার মধ্যেই মুক্তি: সময় ও ব্যয় সাশ্রয়
ই-বেইলবন্ড চালুর ফলে দেশের বিচার বিভাগে গতির সঞ্চার হবে। এর আগে একজন আসামি আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পর তার জামিননামা বা বেইলবন্ড জেলখানায় পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগত। অনেক ক্ষেত্রে আদালত থেকে জেলগেটে আদেশের কপি পৌঁছাতেই কয়েক দিন পার হয়ে যেত। ডিজিটাল এই পদ্ধতির মাধ্যমে এখন থেকে আদালত বেইলবন্ড ইস্যু করার মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে আসামিকে মুক্তি দেওয়া সম্ভব হবে। এটি বিচারপ্রার্থী, কারা প্রশাসন ও আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্ট সবার সময় ও অর্থ সাশ্রয় করবে।
১২ ধাপের জটিলতা ও দুর্নীতির অবসান
আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল জানান, আগে একজন আসামিকে জামিন পাওয়ার পর প্রায় ১২টি প্রশাসনিক ধাপ পার হয়ে মুক্তি পেতে হতো। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় ফাইলের পেছনে ছুটতে গিয়ে সাধারণ মানুষের প্রচুর টাকা খরচ হতো এবং তারা চরম হয়রানির শিকার হতেন। অনেক সময় দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হতেন বিচারপ্রার্থীরা। ডিজিটাল সিস্টেমে এই ধাপগুলো বিলুপ্ত হওয়ায় এখন সরাসরি অনলাইন ডাটাবেজের মাধ্যমে তথ্য জেলখানায় চলে যাবে। এতে অসাধু কর্মকর্তা বা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য পুরোপুরি বন্ধ হবে।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ
ডিজিটাল জামিননামার বড় একটি সুবিধা হলো এর স্বচ্ছতা। ই-বেইলবন্ড প্রক্রিয়ায় কোন ফাইল কার টেবিলে আছে, কে কখন ডিজিটাল স্বাক্ষর করলেন—তার প্রতিটি সেকেন্ডের রেকর্ড সিস্টেমে জমা থাকবে। ফলে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী চাইলেই ফাইল আটকে রেখে মুক্তি বিলম্বিত করতে পারবেন না। এই ব্যবস্থায় প্রতিটি পদক্ষেপের স্বচ্ছতা থাকায় বিচার বিভাগ ও কারা প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় ও জবাবদিহিতা আগের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
কেন এই সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ?
আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেন, “আমরা বিচার ব্যবস্থাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে চাই। মানুষ যেন বিচার পাওয়ার পর মুক্তির জন্য জেল গেটে দিনের পর দিন অপেক্ষা না করে, সেটিই আমাদের লক্ষ্য।” এটি নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের পথে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই সিস্টেমটি সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে (আইসিটি বিভাগের সহায়তায়) তৈরি করা হয়েছে, ফলে এটি পরিচালনার জন্য কোনো বিদেশি ভেন্ডরের ওপর নির্ভর করতে হবে না।