
চলতি অর্থবছরেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, এই লক্ষ্য অর্জনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তির ওপর নির্ভর করতে হবে না।
সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর গুলশানে পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) ভিত্তিক বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতিপ্রবাহ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।
গভর্নর জানান, বর্তমানে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে সংহতকরণের প্রক্রিয়া চলছে। ব্যালান্স অব পেমেন্টস, বৈদেশিক খাত ও রিজার্ভ—এই তিন ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। তাঁর ভাষায়, চলতি অর্থবছরে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ অর্জন তো হবেই, বরং তা অতিক্রম করার সম্ভাবনাও রয়েছে। আইএমএফের অর্থ ছাড়াও এই অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব হওয়ায় পরিস্থিতি এখন অনেকটাই স্বস্তিদায়ক। অতিরিক্ত কোনো বৈদেশিক অর্থ এলে সেটিকে বাড়তি সুবিধা হিসেবেই দেখা হবে।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনে গুলশানের পুলিশ প্লাজা কনকর্ডে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেপুটি ব্রিটিশ হাইকমিশনার ও ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর জেমস গোল্ডম্যান।
গভর্নর আরও বলেন, সুদের হার ও বিনিময় হার নিয়ে দীর্ঘদিন উদ্বেগ থাকলেও এখন বিনিময় হার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। টাকাকে আকর্ষণীয় করার ফলে ব্যাংকগুলো স্বেচ্ছায় ডলার বিক্রি করছে। কোনো শর্ত ছাড়াই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতিমধ্যে ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার কিনেছে, যা আইএমএফ সহায়তার পরিমাণের চেয়েও বেশি। এর ফলে বাজারে প্রায় ৪৫ বিলিয়ন টাকা প্রবাহিত হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে তা ৮ শতাংশের ওপরে থাকলেও লক্ষ্য হচ্ছে একে ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা। বিনিময় হার ও বৈশ্বিক বাজার স্থিতিশীল থাকলে এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহে বড় বাধা না এলে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে। তখন নীতি সুদহার কমানোর প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। ইতিমধ্যে বড় গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ঋণের সুদহার ১১ থেকে ১২ শতাংশে নেমে এসেছে।
ব্যাংক খাতের আমানত পরিস্থিতি নিয়ে গভর্নর জানান, গত ডিসেম্বর মাসে আমানত বৃদ্ধির হার বেড়ে ১১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে এবং মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় ২০ ট্রিলিয়ন টাকায় পৌঁছেছে। তাঁর প্রত্যাশা, এই প্রবৃদ্ধি ১৪ শতাংশে উন্নীত হবে। এই অর্থ নতুন টাকা ছাপিয়ে নয়, বরং বৈদেশিক লেনদেনের উদ্বৃত্ত থেকেই এসেছে। আমানত বৃদ্ধির হার ১৪ শতাংশে পৌঁছালে বেসরকারি খাতে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন টাকা নতুন অর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা অর্থনীতির তারল্য সংকট কাটাতে সহায়ক হবে এবং সুদের হার কমাতেও ভূমিকা রাখবে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জেমস গোল্ডম্যান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের সময়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। সফল পরিবর্তনের জন্য স্বল্পমেয়াদি সমাধানের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ভিত্তি গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। এর জন্য কার্যকর নীতিমালা, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, মানসম্মত সেবা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য অপরিহার্য।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, দেশে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার কাছে বিপুল তথ্যভান্ডার রয়েছে, যা এক অর্থে ‘ডেটার স্বর্ণখনি’। তবে এসব তথ্য নিয়মিত ও সময়মতো প্রকাশ না হওয়া এবং আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী উপস্থাপনের ঘাটতির কারণে নীতিনির্ধারক ও বিনিয়োগকারীরা প্রয়োজনীয় সুবিধা পাচ্ছেন না।
-আফরিনা সুলতানা/









