বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও উদ্বেগজনকহারে অসংক্রামক রোগে (এনসিডি) মৃত্যু বাড়ছে। মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যানসার, কিডনি রোগ, শ্বাসতন্ত্রের রোগ, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ যা মোট মৃত্যুর ৭০ শতাংশের জন্য দায়ী। বাকি ৩০ শতাংশের মৃত্যু হয় অন্যান্য রোগে।
অথচ মোট স্বাস্থ্য বাজেটে এনসিডির অংশ মাত্র চার শতাংশ, আর অন্যান্য খাতে বরাদ্দ ৯৬ শতাংশ। এসব রোগ মোকাবিলায় অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ খুবই সামান্য, মোট স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র চার দশমিক দুই শতাংশ। যা ক্রমশ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে অসংক্রামক রোগজনিত অকাল মৃত্যু এক-তৃতীয়াংশে কমিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার। অথচ একটি দেশের স্বাস্থ্যখাতে জাতীয় বাজেটের কমপক্ষে ১৫ শতাংশ এবং মোট জিডিপির পাঁচ শতাংশ বরাদ্দ থাকা উচিত। তবে বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ দীর্ঘদিন যাবৎ জাতীয় বাজেটের প্রায় পাঁচ শতাংশ এবং মোট জিডিপির এক শতাংশের নিচে ঘুরপাক খাচ্ছে। তাই আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে অসংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান প্রকোপ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, বিশ্বব্যাপী অসংক্রামক রোগের বিস্তার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সার, কিডনি রোগ, শ্বাসতন্ত্রের রোগ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে বছরে চার কোটিরও অধিক মানুষ মারা যায়, যা বিশ্বব্যাপী মোট মৃত্যুও প্রায় ৭৪ শতাংশ। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এই মৃত্যুহার আরও বেশি, প্রায় ৭৭ শতাংশ।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে বছরে প্রায় পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ২০০ মানুষের জীবন কেড়ে নেয় বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ এবং যার ১৯ শতাংশই অকাল মৃত্যু। তবে এই খাতে বাজেট বরাদ্দ খুবই অপ্রতুল। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র চার দশমিক দুই শতাংশ অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে ব্যয় করা হয়, যা খুবই কম। অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশে মাথাপিছু বরাদ্দের পরিমাণও অত্যন্ত কম, বছরে মাত্র ০.০৮ ডলার এবং যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সুপারিশকৃত বরাদ্দ ১ দশমিক ৫ ডলারের চেয়ে অনেক কম।
দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতের জন্য বরাদ্দ ছিল মোট জাতীয় বাজেটের ৫ দশমিক ২ শতাংশ, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শূন্য দশমিক এক শতাংশ বাড়িয়ে করা হয়েছে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ।
অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, একটি দেশের স্বাস্থ্যখাতে জাতীয় বাজেটের কমপক্ষে ১৫ শতাংশ এবং মোট জিডিপির পাঁচ শতাংশ বরাদ্দ থাকা উচিত। তবে বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ দীর্ঘদিন যাবৎ জাতীয় বাজেটের প্রায় পাঁচ শতাংশ এবং মোট জিডিপির এক শতাংশের নিচে ঘুরপাক খাচ্ছে। যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় গড় ব্যয় চার দশমিক ৫৯ শতাংশ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে বাজেট সবচেয়ে কম।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দাতা সংস্থা গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই) বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মাদ রুহুল কুদ্দুস বলেন, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে অসংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান প্রকোপ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কেবল কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা গেলে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের মতো ভয়াবহ অসংক্রামক রোগ অনেকাংশেই কমিয়ে আনাসহ অসংখ্য জীবন বাঁচানো যেতে পারে। বিদ্যমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ খাতে বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানোসহ অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে টেকসই অর্থায়ন জরুরি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, অসংক্রামক রোগের প্রকোপ যেন না বাড়ে সে জন্য স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, যেমনÑ সুষম খাবার খাওয়া, নিয়মিত ব্যায়াম করা, ধূমপান ও মদ্যপান বর্জন, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং মানসিক চাপ কমানো জরুরি। এছাড়া নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সচেতনতা বাড়াতে হবে, যা হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার ও স্ট্রোকের মতো রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত ৩৫ বছর বয়সের পর থেকে বছরে একবার পরীক্ষা করানো উচিত। পাশাপাশি বাজেট বৃদ্ধির বিষয়ে বিশেষভাবে জোর দিতে হবে।
স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) ড. মো. এনামুল হক বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জাতীয় বাজেটের কমপক্ষে ১৫ শতাংশ স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দের সুপারিশ করে। বাস্তবিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বাংলাদেশ সরকারের সর্বশেষ স্ট্র্যাটেজিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান অনুযায়ী তা সাত শতাংশ করার সুপারিশ করা হলেও বিগত বছরগুলোতে স্বাস্থ্য বাজেট পাঁচ শতাংশের মধ্যেই রয়েছে। তিনি বলেন, অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় এ খাতে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না পাশাপাশি বরাদ্দকৃত অর্থ খরচের ক্ষেত্রে দক্ষতাও বৃদ্ধি করতে হবে।
-বায়েজীদ মুন্সী










