# বিদেশি দূতাবাস ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রধান ইস্যু; জাতীয় নির্বাচন এবং পরবর্তী সরকার প্রসঙ্গ
দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দিন দিন বাড়ছে নির্বাচনী উত্তাপ। এ উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ছে কূটনৈতিক অঙ্গনেও। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে ঢাকাস্থ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের তৎপরতা বেড়ে গেছে। অতীতে বাংলাদেশের প্রতিটি সংসদ নির্বাচন ঘিরে বিদেশি কূটনীতিকদের এ ধরনের তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। এবারও সেই ধারাবাহিকতাই চলছে।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বিদেশি কূটনীতিকদের যোগাযোগ ধীরে ধীরে বাড়ছে। এরমধ্যে প্রধান উপদেষ্টা ও শীর্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশনের প্রতিনিধি দল। ইতোমধ্যে সারাদেশে ৫৬ জন দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষক মোতায়েন করেছে সংস্থাটি। পর্যবেক্ষকরা দেশের ৬৪টি জেলায় শহর ও গ্রাম উভয় এলাকায় কাজ শুরু করেছেন। নির্বাচন ও গণভোটের কাছাকাছি সময়ে আরও ৯০ জন স্বল্পকালীন পর্যবেক্ষক যুক্ত হবেন। নির্বাচনের দিনে প্রায় ২০০ জন ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষক মাঠে থাকবেন। এই পর্যবেক্ষক মিশনে কেবল ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলোই নয়, বরং কানাডা, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডের প্রতিনিধিরাও অংশ নিয়েছেন।
এছাড়া প্রভাবশালী বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরাও সাক্ষাৎ করছেন শীর্ষ দলগুলোর প্রধানদের সঙ্গে। এরমধ্যে ইইউ এক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পথে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়াকে আমরা সমর্থন করি। দায়িত্বশীলভাবে কাজ করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে ইইউ বলেছে, ‘আমরা রাজনৈতিক দলগুলোকে পরবর্তী ধাপে গঠনমূলকভাবে অংশগ্রহণ করতে উৎসাহিত করছি।’ বার্তায় আরও বলা হয়, আমরা রাজনৈতিক দলগুলোকে পরবর্তী পদক্ষেপে গঠনমূলকভাবে অংশগ্রহণ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করারও আহ্বান জানাই।
জানা যায়, নির্বাচন ঘনিয়ে এলেই কূটনীতিকদের দৌড়ঝাঁপ, সরকার আর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ বাংলাদেশে যেন অনেকটাই রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। এবারের নির্বাচনেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। গত কয়েকদিন ধরেই দেখা যাচ্ছে বিদেশি কূটনীতিকদের তৎপরতা। সংস্কার প্রস্তাবে সমর্থন থাকলেও তারা দ্রুত নির্বাচনের পক্ষে। নির্বাচনের দিনক্ষণ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বিদেশি দূতাবাস ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের আলোচনার প্রধান ইস্যু হয়ে উঠছে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং পরবর্তী সরকার প্রসঙ্গ।
কূটনীতিকদের মতে, রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষমতা জনগণের ভোটে নির্বাচিত রাজনৈতিক শক্তির হাতে যত দ্রুত সম্ভব তুলে দেওয়া উচিত।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সম্প্রতি সাক্ষাৎ করেছেন তিন দেশের রাষ্ট্রদূত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনীতিকরা। তারেক রহমানের সঙ্গে আলাদাভাবে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান পর্যবেক্ষক ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ইভারস আইজাবস, তুরস্কের রাষ্ট্রদূত রামিস সেন এবং মিসরের রাষ্ট্রদূত ওমর ফাহমি। এছাড়াও বৈঠক ও আলোচনা হয়েছে, বিএনপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার এবং তারেক রহমানের সঙ্গে আলাদাভাবে দেখা করেন পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান হায়দার। এর আগে ৭ জানুয়ারি বিএনপি প্রধানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে গুলশান কার্যালয়ে যান বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। একই দিনে সাক্ষাৎ করেন জার্মান রাষ্ট্রদূত এবং অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনারও।
সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন বেশ কয়েকজন কূটনীতিক। ১২ জানুয়ারি তার সঙ্গে আলাদাভাবে সাক্ষাৎ করেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান পর্যবেক্ষক ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ইভারস আইজাবস এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। এর আগে জামায়াত আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধ দল। এনসিপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক হচ্ছে কূটনীতিকদের। গত শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান পর্যবেক্ষক ইভারস আইজাবসের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক হয় এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ দলটির নেতাদের। গত ৪ জানুয়ারি মার্কিন দূতাবাসে দূতাবাস কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক হয় এনসিপি নেতাদের।
এ নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে, প্রধান উপদেষ্টা দেশের চলমান সংস্কার প্রক্রিয়া, যুব নেতৃত্বে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন ও আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পর্কে কূটনীতিকদের মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে অবহিত করছেন। এখন আমরা জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। যা হবে জাতির জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
প্রেস উইং আরও জানায়, ইতোমধ্যে প্রাক-নির্বাচনী পরিবেশ মূল্যায়ন করে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা আইআরআই আট দফা সুপারিশ প্রকাশ করেছে। যাতে বলা হয়েছেÑ প্রাক-নির্বাচনী পরিবেশ এখনো নাজুক, দলগুলোয় প্রার্থী মনোনয়নে এখনো স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। রাজনৈতিক ও অংশীদারদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ গুরুত্বপূর্ণ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর নিরপেক্ষতার ক্ষেত্রে অবিশ্বাস রয়েছে। আইআরআই মনে করে, তরুণদের নেতৃত্বাধীন দলের আবির্ভাব ও প্রবাসী বাংলাদেশিসহ প্রথমবারের মতো বিপুলসংখ্যক ভোটারের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে সম্ভাব্য এক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এ পরিস্থিতি দেশের গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণে তাদের ধারাবাহিক ভূমিকারও আভাস আছে। বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন নিয়ে জাতিসংঘেরও রয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। ঢাকায় সংস্থাটির আবাসিক সমন্বয়ক গোয়েন লুইস জানিয়েছেন, আমরা আগামীদিনে বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও আন্তর্জাতিক মানের নির্বাচন দেখতে চাই। এই কাক্সিক্ষত নির্বাচন অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেবে।
এ ব্যাপারে সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিক মুন্সী ফয়েজ উল্লাহ বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো একটি সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। কূটনীতিক, রাজনৈতিক এবং ব্যবসায়ীরাসহ সকল শ্রেণির মানুষ নির্বাচনের জন্য অপেক্ষমাণ। তিনি বলেন, বাংলাদেশে অবস্থান করা কূটনীতিকরা কি বললেন সেটা গুরুত্ব দেওয়ার চেয়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন আমাদের দেশের সাধারণ জনগণ নির্বাচন নিয়ে কি চিন্তা করছে সেটার। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ দেশের সকল কূটনীতিক তাদের অবস্থান থেকে নির্বাচনের জন্য যা করণীয় সেটিই করছেন। সাবেক এ রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, প্রধান উপদেষ্টার সর্বশেষ ভাষণে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করার চেষ্টা করেছে। যা কূটনীতিকরা ভালো হিসেবে নিয়েছেন। তবে রাজনীতিবিদরা এটাকে কেমন করে নিচ্ছেন সেটা ভাববার বিষয়।
এসএম শামসুজ্জোহা










