ওষুধ শিল্পের সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা না করেই সরকার অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের হালনাগাদ তালিকার অনুমোদন দিয়েছে—এমন অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতি (বাপি)। সংগঠনটির দাবি, মূল্য নির্ধারণ কমিটি একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে বাপিকে পুরো প্রক্রিয়া থেকে দূরে রেখেছে।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) গাজীপুরের একটি রিসোর্টে বাপির উদ্যোগে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ফার্মা ইন্ডাস্ট্রি: প্রেজেন্ট চ্যালেঞ্জ অ্যান্ড ফিউচার প্রসপেক্টস’ শীর্ষক কর্মশালায় এসব কথা বলেন বাপির মহাসচিব ও ডেল্টা ফার্মা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মো. জাকির হোসেন।
তিনি বলেন, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়ন এবং এসব ওষুধের মূল্য নির্ধারণ অত্যন্ত কারিগরি ও বাস্তবভিত্তিক বিষয়। অথচ এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শিল্পের কোনো অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি। এমনকি ওষুধ শিল্পের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন বাপিকেও বিষয়টি জানানো হয়নি।
ডা. জাকির হোসেন উল্লেখ করেন, গত ৮ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান জানান, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় নতুন করে ১৩৫টি ওষুধ যুক্ত করা হয়েছে। ফলে বর্তমানে তালিকাভুক্ত অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯৫টি।
এই তালিকাভুক্ত ওষুধগুলোর দাম সরকার নির্ধারণ করবে এবং নির্ধারিত দামের বাইরে বিক্রি করা যাবে না। পাশাপাশি প্রতিটি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানকে তাদের মোট উৎপাদনের অন্তত ২৫ শতাংশ এই তালিকার ওষুধ থেকে রাখতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নীতিমালা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণ করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে ডা. জাকির হোসেন বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিয়মিত প্রশাসনিক কাজের বাইরে গিয়ে বড় ধরনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে। তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হোক। তাঁর মতে, উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামালের মূল্য, মান নিয়ন্ত্রণের খরচ ও বাজার বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে ওষুধের দাম নির্ধারণ করলে তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না।
কর্মশালায় বাপির সভাপতি আব্দুল মুক্তাদির বলেন, দেশের ওষুধ শিল্প বর্তমানে গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বাইরে প্রায় ৬০ শতাংশ ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান রুগ্ন অবস্থায় রয়েছে।
তিনি জানান, এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে বা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে দেশের ওষুধে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়বে।
আব্দুল মুক্তাদির আরও বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠানকে গত ৩০ থেকে ৪০ বছর ধরে একই দামে ওষুধ বিক্রি করতে হচ্ছে। ১৯৯০ সালে যে দামে ওষুধ বিক্রি করা হতো, ২০২৫–২৬ সালেও সরকার সেই দাম বাড়াতে অনুমতি দিচ্ছে না। অথচ এই সময়ে কাঁচামালের আন্তর্জাতিক মূল্য, উৎপাদন ব্যয়, শ্রম ব্যয় এবং মান নিয়ন্ত্রণের খরচ কয়েক গুণ বেড়েছে। এ অবস্থায় শিল্পে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি ১৯৯৪ সালের ওষুধ নীতিকে দেশের ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের বিকাশের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, ওই নীতির ফলে বাংলাদেশ ওষুধে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা তৈরি হয়। তবে ২০১৬ সালের পর থেকে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ, বৈষম্যমূলক নীতি ও বাস্তবতা বিবর্জিত সিদ্ধান্ত শিল্পকে দুর্বল করে দিয়েছে।
কর্মশালায় আরও বক্তব্য দেন বাপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান, কোষাধ্যক্ষ হালিমুজ্জামান, বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক ইজাজ এবং সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ শুভ।
-আফরিনা সুলতানা/










