সাতক্ষীরায় সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প এখন আর উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে নয়, চলছে রাজনৈতিক পরিচয়ে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী টেন্ডার সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। জেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলের নাম ভাঙিয়ে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেট বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি টাকার কাজ ভাগিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সাতক্ষীরা এলজিইডি, জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা পরিষদ, গণপূর্ত বিভাগসহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে এই সিন্ডিকেটের একচ্ছত্র আধিপত্য। দরপত্র আহ্বান হলেই শুরু হয় হুমকি, বাধা ও ভয়ভীতি প্রদর্শন। লাইসেন্সধারী সাধারণ ঠিকাদাররা অনেক ক্ষেত্রে টেন্ডার সিডিউল কিনতেই পারছেন না। কেউ সাহস করে সিডিউল কিনলেও জমা দিতে গিয়ে পড়ছেন বাধার মুখে।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, সিন্ডিকেটের সদস্য না হলে দরপত্র বাক্সে কাগজ ফেলাও অসম্ভব। আর যদি কেউ গোপনে জমা দিয়েও দেন, তাহলে শুরু হয় কাগজপত্রে অজুহাত দেখিয়ে বাতিলের নাটক। অথচ সিন্ডিকেটভুক্ত ঠিকাদারদের কাগজ যতই ত্রুটিপূর্ণ হোক না কেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহযোগিতায় তারাই কাজ পেয়ে যান।
গভীর অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই টেন্ডার সিন্ডিকেটের সঙ্গে গোপনে আর্থিক চুক্তিতে জড়িত রয়েছেন বিভিন্ন দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। ওপেন নিলাম ও দরপত্র প্রক্রিয়া কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ; বাস্তবে সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠা বাটপার, দখলবাজ ও চাঁদাবাজদের নেতৃত্বাধীন চক্রের মাধ্যমে।
২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর সরকার পতনের পরও সাতক্ষীরায় থামেনি এই দখলদারিত্ব। বরং রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা পরিষদ ও গণপূর্ত বিভাগ থেকে কোটি কোটি টাকার কাজ ভাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে।
এর একটি জ্বলন্ত উদাহরণ সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড-২ এর অধীনে বেতনা নদীর মাটি অপসারণ কাজ। সূত্র জানায়, মাছখোলার খুকুমনি নামে এক ঠিকাদার নিয়ম মেনে দরপত্রে অংশগ্রহণ করে যাচাই-বাছাই শেষে ৫ নম্বর প্যাকেজের কাজ পান। কিন্তু তিনি কোনো সিন্ডিকেটের সঙ্গে আপোষ না করায় তার বরাদ্দকৃত মাটি দিনে-রাতে ২০ থেকে ৪০ ট্রলি ও ভ্যানে করে তুলে নিয়ে যাচ্ছে একটি প্রভাবশালী চক্র।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী ঠিকাদার খুকুমনি বলেন,“আমি নিয়ম মেনে নিলামে অংশ নিয়ে কাজ পেয়েছি। কিন্তু আমার বরাদ্দকৃত মাটি প্রকাশ্যেই লুট হয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দিয়েছি। আমি কোনো সিন্ডিকেটের সঙ্গে আপোষ করবো না।”
সাধারণ ঠিকাদারদের অভিযোগ, এই টেন্ডার সিন্ডিকেট ভেঙে না দিলে সাতক্ষীরায় সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প কাগজে-কলমেই থেকে যাবে, আর বাস্তবে লুটপাট চলতেই থাকবে।
–এম এম রবিউল ইসলাম, সাতক্ষীরা










