বুধবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, তাকে জানানো হয়েছে যে, ইরানে বিক্ষোভকারীদের হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়েছে এবং যেসব ফাঁসির পরিকল্পনা ছিল, সেগুলোও স্থগিত করা হয়েছে।এসব মন্তব্যে ইরান নিয়ে তার আগের কড়া অবস্থান থেকে কিছুটা সংযত মনোভাবের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
‘ফাঁসির প্রশ্নই আসে না,’ তিনি বলেন।ওয়াশিংটন ডিসি থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক মাইক হানা জানান, ট্রাম্পের এসব বক্তব্য ইরানের প্রতি তার সুর নরম হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
ওয়াশিংটনের স্টিমসন সেন্টারের বিশিষ্ট ফেলো বারবারা স্লাভিন বলেন, ইরান প্রশ্নে ট্রাম্প সম্ভবত দ্বিধায় আছেন। তার ভাষায়, ‘তিনি হয়তো আরেকটি দ্রুত জয় চাইছেন, কিন্তু একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়াতে চান না, যা তার স্বভাবের বিরুদ্ধে।’
বারবারা স্লাভিন বলেন, ট্রাম্প সীমিত পরিসরে হামলা চালাতে পারেন, যাতে তিনি দাবি করতে পারেন যে ইরানি জনগণকে ‘সহায়তা’ করেছেন, তবে বড় ধরনের উত্তেজনা এড়িয়ে।
এর আগে বুধবার ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্র কাতারের একটি বিমানঘাঁটি থেকে কিছু কর্মী সরিয়ে নেয়। কারণ, এক ইরানি কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানতে পারে। সম্ভাব্য আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কায় কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের জন্য সতর্কতা জারি করেছে।
ইরানের পাল্টা জবাবের প্রস্তুতি
ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করলে তারা পাল্টা জবাব দিতে প্রস্তুত। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) প্রধান মোহাম্মদ পাকপুর বলেন, চলমান বিক্ষোভের পেছনে দায়ী ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরান জবাব দিতে প্রস্তুত।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে উদ্ধৃত এক লিখিত বিবৃতিতে পাকপুর বলেন, ‘শত্রুর ভুল হিসাবের জবাব দিতে আইআরজিসি সর্বোচ্চ প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে।’ তিনি ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ‘ইরানের যুবকদের হত্যাকারী’ বলে আখ্যা দেন।
ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি আরও বলেন, জানুয়ারি ৮ থেকে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভে কঠোর দমন-পীড়নের পর পরিস্থিতি এখন সরকারের নিয়ন্ত্রণে। তিন দিনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পর এখন পরিস্থিতি শান্ত। আমরা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আছি।
তেহরান থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক তোহিদ আসাদি জানান, জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতের পর থেকে দেশজুড়ে মানুষ মানসিকভাবে যুদ্ধের ছায়া অনুভব করছে।
তার ভাষায়, ‘অনেকেই নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলবে।’
ডিসেম্বরে স্থানীয় মুদ্রার দরপতন ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে দোকানিরা রাস্তায় নামলে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে তা সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিক্ষোভে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হওয়ার কথা স্বীকার করেছে। তারা শহীদ ফাউন্ডেশনের প্রধানকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ‘সশস্ত্র ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ এসব মৃত্যুর জন্য দায়ী।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের হিসাবে, দুই সপ্তাহের অস্থিরতায় ১০০–এর বেশি নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন। বিরোধী কর্মীদের দাবি, নিহতের সংখ্যা আরও বেশি এবং এর মধ্যে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, তারা ২৪০০ এর বেশি বিক্ষোভকারী, ১৫০ এর বেশি নিরাপত্তা সদস্য ও সরকারপন্থীর মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে।
এদিকে, ইরানে প্রায় সম্পূর্ণ টেলিযোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। নেটব্লকস জানিয়েছে, এই ব্ল্যাকআউট ১৪৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বুধবার জানায়, তারা এমন প্রমাণ পেয়েছে যাতে দেখা যায়, গত সপ্তাহে ইরানে নজিরবিহীন মাত্রায় ব্যাপক ও বেআইনি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যেখানে মূলত শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী ও পথচারীদের লক্ষ্য করা হয়েছে।
সংস্থাটি জানায়, যাচাইকৃত অডিও–ভিডিও প্রমাণে মাথা ও চোখে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর ও প্রাণঘাতী আঘাতের চিত্র দেখা গেছে। পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনী পালিয়ে যাওয়া বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া করে সরাসরি গুলি চালিয়েছে বলেও প্রমাণ মিলেছে।
সূত্র: আল জাজিরা
-মামুন










