ইরানজুড়ে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ও সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ (HRANA)-এর দাবি অনুযায়ী, বিক্ষোভে এ পর্যন্ত ২ হাজার ৫৭১ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে বড় অংশই সাধারণ বিক্ষোভকারী। এছাড়া নিরাপত্তা বাহিনীর অন্তত ৪৫ জন সদস্য নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে নিহতের এই বিশাল সংখ্যা এবং বিক্ষোভের গতিপ্রকৃতি নিয়ে নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের মধ্যে রয়েছে নানা মতভেদ।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বর্তমান পরিস্থিতির মূলে রয়েছে দীর্ঘদিনের গভীর অর্থনৈতিক সংকট। একদিকে সরকারি দুর্নীতি ও অদক্ষতা, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কঠোর নিষেধাজ্ঞা সাধারণ মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী শ্রেণি দারিদ্র্যের চাপে পিষ্ট হয়ে রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছে। তবে এই স্বতঃস্ফূর্ত গণ-অসন্তোষকে ঘিরে শুরু হয়েছে এক জটিল ভূ-রাজনৈতিক খেলা।
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সংবাদমাধ্যম ‘মিডিলইস্ট আই’-এর এক প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, ইরানের এই অভ্যন্তরীণ সংকটকে ব্যবহার করছে ইসরায়েল ও পশ্চিমা শক্তিগুলো। বিশেষ করে বিবিসি পার্সিয়ানসহ কিছু পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে অতিরঞ্জিত সংবাদ প্রচারের অভিযোগ উঠেছে। সমালোচকদের মতে, গাজায় ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযান থেকে বিশ্ববাসীর মনোযোগ সরাতেই ইরান ইস্যুকে বড় করে দেখানো হচ্ছে। এমনকি ১৯৫৩ সালের সিআইএ-সমর্থিত অভ্যুত্থানের আদলে বর্তমানেও ‘সফট পাওয়ার’ প্রয়োগের মাধ্যমে ইরানের শাসনব্যবস্থা অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি জনগণের অর্থনৈতিক ক্ষোভকে যৌক্তিক বলে স্বীকার করলেও, একে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন। তার মতে, বিক্ষোভের আড়ালে ইরানকে ভেঙে ছোট ছোট জাতিগত রাষ্ট্রে পরিণত করাই ইসরায়েলি প্রকল্পের আসল উদ্দেশ্য।
২০২২ সালের ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলনের তুলনায় বর্তমান বিক্ষোভের চরিত্রে ভিন্নতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সে সময়ের স্বতঃস্ফূর্ত নারী নেতৃত্বের বদলে বর্তমান আন্দোলন অনেক বেশি সহিংস এবং এতে মোসাদ ও সিআইএ-র মতো বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার প্রভাবের ছাপ দেখছেন অনেক বিশ্লেষক। মসজিদ পুড়িয়ে দেওয়া বা ধর্মীয় উসকানি সৃষ্টির মতো ঘটনাগুলোকে তথাকথিত ‘প্রোপাগান্ডা’ যুদ্ধের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানে বর্তমানে কোনো শক্তিশালী ঘরোয়া রাজনৈতিক বিকল্প না থাকায় সুযোগসন্ধানী বিদেশি মদতপুষ্ট গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় হয়ে উঠেছে। নির্বাসিত রেজা পাহলভি বা এমইকে (MEK)-এর মতো সংগঠনগুলোর জনভিত্তি না থাকলেও পশ্চিমা মিডিয়ায় তাদের কৃত্রিম জনপ্রিয়তা তৈরির চেষ্টা চলছে।
সব মিলিয়ে ইরান এক সংকটকাল অতিক্রম করছে। জনগণের বৈধ দাবির আন্দোলন আজ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ক্ষমতার লড়াইয়ে আটকা পড়েছে। একদিকে অভ্যন্তরীণ সংস্কারের চাপ, অন্যদিকে সম্ভাব্য বিদেশি সামরিক হামলার আশঙ্কা—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে ইরানের সাধারণ মানুষ। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন নির্ভর করছে তেহরানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির কৌশলের ওপর।
-এম. এইচ. মামুন










