ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা, দেশীয় গ্যাসের ক্রমহ্রাসমান মজুত এবং আমদানি নির্ভরতার কারণে
গভীর কাঠামোগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত। এই সংকট মোকাবিলা এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে সরকার আগামী ২৫ বছরের জন্য ‘এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার সেক্টর মাস্টার প্ল্যান ২০২৫’ প্রণয়ন করেছে। আর এটি বাস্তবায়নে গ্রহন করা হয়েছে মহাপরিকল্পনা। যার মূল লক্ষ্য হলো আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎস ও টেকসই নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ধাবিত হওয়া।
বাংলাদেশ বর্তমানে তার ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা, অন্যদিকে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও ডলার সংকটের কারণে আমদানিকৃত জ্বালানির অস্থির বাজার। এই দ্বিমুখী সংকট থেকে উত্তরণ এবং ২০৫০ সালের মধ্যে একটি ‘নেট জিরো’ বা কার্বন নিরপেক্ষ সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার প্রণয়ন করেছে ‘এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার সেক্টর মাস্টার প্ল্যান ২০২৫’ (ঊচঝগচ)। এটি আগামী ২৫ বছরের জন্য বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার একটি সুদূরপ্রসারী রোডম্যাপ।
এদিকে বর্তমানে বাংলাদেশের প্রাথমিক জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়। নতুন মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে এই আমদানিনির্ভরতা ৫০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, এ পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশকে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর অতিনির্ভরতা থেকে ধীরে ধীরে সরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে। বর্তমানে দেশের চাহিদার ৭০ শতাংশের বেশি প্রাথমিক জ্বালানি আমদানি করতে হয়।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বলেন, মহাপরিকল্পনাটির খসড়া প্রধান উপদেষ্টার কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে; তিনি এটি প্রণয়নে সম্মতি দিয়েছেন।
জ্বালানি উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যেই খসড়াটি প্রস্তুত করেছি। এটি এখন জনগণের যাচাই-বাছাইয়ের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে, যাতে সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা তাদের মতামত জানাতে পারেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘অংশীজনদের মতামত অন্তর্ভুক্ত করার পর মহাপরিকল্পনাটি চূড়ান্ত ও অনুমোদন করা হবে, যাতে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার কাজ করার জন্য একটি সুস্পষ্ট কাঠামো হাতের কাছে পায়।’
জানা গেছে, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে স্থলভাগে ১৫০টি নতুন কূপ খনন করার পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশে গ্যাস পাওয়ার সফলতার হার বৈশ্বিক গড়ের (১০টিতে ১টি) তুলনায় অনেক বেশি (১.৩টিতে ১টি)। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দেশীয় গ্যাসের অবদান বর্তমানের তুলনায় বাড়িয়ে অন্তত ৬০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সূত্র মতে, চলতি বছরই গভীর সমুদ্র ও উপকূলে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হবে এবং চট্টগ্রাম ও সিলেটে থ্রিডি সিসমিক জরিপ শুরু হবে। ২০৩০-২০৪০ সালের মধ্যে অফশোর থেকে গ্যাস উত্তোলনের আশা করা হচ্ছে।
বর্তমানে বার্ষিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ১০০ টেরাওয়াট-ঘণ্টা, যা ২০৫০ সালে ৪০০ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছাতে পারে। সর্বোচ্চ চাহিদা (চবধশ উবসধহফ) হতে পারে ৫৯ থেকে ৭০ গিগাওয়াট। বর্তমানে বিদ্যুতের বড় অংশ (৪৫%) গ্যাস থেকে আসলেও ২০৫০ সালে সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ হবে প্রধান উৎস। ২০৫০ সাল নাগাদ সৌরবিদ্যুতের অবদান দাঁড়াবে ৩৬ শতাংশ এবং বায়ুবিদ্যুতের ১১ শতাংশ। অর্থাৎ, মোট বিদ্যুতের প্রায় অর্ধেক আসবে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে।
আবার ৭৬৫ কেভি জাতীয় ট্রান্সমিশন ব্যাকবোন এবং স্মার্ট গ্রিড স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করা হবে। এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে আগামী ২৫ বছরে বিপুল অংকের বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।
সরকারি তহবিলের পাশাপাশি জিটুজি (সরকার-টু-সরকার), পিপিপি (সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব) এবং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের (ঋউও) মাধ্যমে এই অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এদিকে ২০৫০ সালের মধ্যে জ্বালানি ভর্তুকি জিডিপির ১ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। আইএমএফ-এর শর্তানুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে এই ভর্তুকি শূন্যে নামিয়ে আনার চাপও রয়েছে।
জ্বালানী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম সামছুল আলম বলেন, বিশাল অংকের ব্যয়বৃদ্ধি আগামীতে দেশ আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর মারাত্মকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে।
তিনি বলেন, এই মহাপরিকল্পনাটি পরিবেশবান্ধব বা সাশ্রয়ী হওয়ার বদলে আমদানিনির্ভর জ্বালানি অবকাঠামো এবং শক্তিশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর সুবিধা নিশ্চিত করার দিকে বেশি ঝুঁকে আছে।
বাংলাদেশের ভূ-তাত্ত্বিক গঠন প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। বিশ্বে গড়ে ১০টি কূপ খনন করে ১টিতে গ্যাস পাওয়া গেলেও বাংলাদেশে প্রতি ১.৩টি কূপেই গ্যাস পাওয়া যায়। এই উচ্চ সাফল্যের হারকে কাজে লাগাতে তিন ধাপের বাস্তবায়ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে:
স্বল্পমেয়াদি (২০২৬-২০৩০): দেশের স্থলভাগে অন্তত ১৫০টি নতুন অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কূপ খনন করা হবে। পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান করা হবে।
মধ্যমেয়াদি (২০৩০-২০৪০): গভীর সমুদ্র (ঙভভংযড়ৎব) থেকে গ্যাস উত্তোলন শুরু এবং কক্সবাজারের মাতারবাড়িতে বিশাল এলএনজি টার্মিনালকে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করা।
দীর্ঘমেয়াদি (২০৪০-২০৫০): চিরাচরিত জ্বালানির বিকল্প হিসেবে হাইড্রোজেন ফুয়েল এবং জিওথার্মাল (ভূ-তাপীয়) জ্বালানির বাণিজ্যিক ব্যবহারের সূচনা।
এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ২০৫০ সাল নাগাদ বছরে প্রায় ৬৪ মিলিয়ন টন কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব হবে। কার্বন ক্রেডিট বিক্রির মাধ্যমে বাংলাদেশ ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয়ের সম্ভাবনা দেখছে। এছাড়া ২০৪০ সালের পর থেকে হাইড্রোজেন জ্বালানির ব্যবহার শুরুর রূপরেখাও দেওয়া হয়েছে। মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী, জ্বালানি খাতকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা হবে। আইএমএফ-এর শর্ত মেনে ২০৩০ সালের মধ্যে ভর্তুকি শূন্যের কোঠায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
ভর্তুকি প্রত্যাহারের ফলে ২০৫০ সালে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় দাম বর্তমানের ৭.৩৪ টাকা থেকে বেড়ে ১৩.৬৬ টাকা এবং প্রতি ঘনফুট গ্যাসের দাম ২২.৯৩ টাকা থেকে বেড়ে ৬৫ টাকায় পৌঁছাতে পারে। এটি শিল্প উৎপাদন এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর বড় প্রভাব ফেলবে, যা মোকাবিলায় দক্ষতা বৃদ্ধি অপরিহার্য।
বিগত সরকারের আমলের ‘অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা’ এবং ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’-এর বোঝা বর্তমান সংকটকে ঘনীভূত করেছে। নতুন পরিকল্পনায় সিস্টেম লস ও সুশাসনের অভাবে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি পড়তে হতে পারে।
এদিকে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডি মনে করে, মাস্টার প্ল্যানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির কথা বলা হলেও এলএনজি অবকাঠামোতে অতিরিক্ত ২৭ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এটি ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে আবারও আমদানিনির্ভরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। এছাড়া অভ্যন্তরীণ কয়লা ব্যবহারের পরিবেশগত ঝুঁকিও একটি বিতর্কের বিষয়। ‘এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার সেক্টর মাস্টার প্ল্যান ২০২৫’ কেবল একটি কারিগরি পরিকল্পনা নয়, এটি বাংলাদেশের জ্বালানি সার্বভৌমত্ব রক্ষার একটি দলিল। উচ্চাভিলাষী এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, বরং জ্বালানি ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়া এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করা জরুরি।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, খসড়া পরিকল্পনায় নামমাত্র নবায়নযোগ্য জ্বালানির কথা বলা হলেও বাস্তবে কার্বন নিঃসরণকারী জ্বালানিকেই প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ‘রিসোর্স অপটিমাইজেশন’ বা সম্পদের সঠিক ব্যবহারের দোহাই দিয়ে দেশীয় কয়লা উত্তোলনের দিকে ঝোঁকার যে প্রবণতা, তা জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রার সাথে সাংঘর্ষিক। এছাড়া এলএনজি ব্যয়ের অস্বাভাবিক উল্লম্ফন।
তিনি এই মহাপরিকল্পনাকে নিছক অর্থনৈতিক দলিল হিসেবে না দেখে একটি ‘রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক’ দলিল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তার অভিযোগের সারসংক্ষেপ হলো, সরকার বিভিন্ন শক্তিশালী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর (চৎবংংঁৎব এৎড়ঁঢ়ং) চাপে রয়েছে। বৃহত্তর পরিবেশগত বা অর্থনৈতিক লক্ষ্যের চেয়ে বিশেষ মহলের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা এই পরিকল্পনায় প্রাধান্য পেয়েছে। পরিকল্পনায় ‘সৌরবিদ্যুতের নাম ব্যবহার করে’ অন্য দূষণকারী জ্বালানিকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি এক ধরণের বিভ্রান্তি তৈরির প্রচেষ্টা।
‘এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার সেক্টর মাস্টার প্ল্যান ২০২৫’ বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের জন্য একটি উচ্চাভিলাষী এবং দিক-পরিবর্তনকারী দলিল। এটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে আমদানিনির্ভরতা কমে আসবে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা সুসংহত হবে। তবে বিশাল বিনিয়োগের সংস্থান করা, ভর্তুকি হ্রাসের ফলে জনগণের ওপর চাপ সামলানো এবং সঞ্চালন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন নিশ্চিত করাই হবে আগামী সরকারগুলোর জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ। প্রতিবেদনটি এখন জনমতামতের জন্য উন্মুক্ত, যা অংশীজনদের অংশগ্রহণে আরও সমৃদ্ধ হওয়ার সুযোগ রাখে।
-হাসান মাহমুদ রিপন










