ভোক্তা পর্যায়ে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। কিন্তু কাগজে-কলমের সেই দামের সঙ্গে বাজারের বাস্তবতার কোনো মিল নেই। ডিলার থেকে খুচরা বিক্রেতা— হাত বদল হলেই বাড়ছে দাম আর সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ ভোক্তারা।
চলতি জানুয়ারি মাসের জন্য বিইআরসি ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করেছে ১ হাজার ৩০৬ টাকা। অথচ নারায়ণগঞ্জ, রাজধানীর কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এই সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায়। কোনো কোনো এলাকায় তথাকথিত সংকটের অজুহাতে দাম হাঁকানো হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। অর্থাৎ সরকারি দামের চেয়ে প্রতি সিলিন্ডারে ৭০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত আদায় করা হচ্ছে।
ক্রেতাদের অভিযোগ, বাজারে এলপিজির প্রকৃত কোনো সংকট নেই। কৃত্রিমভাবে সরবরাহ কম দেখিয়ে দাম বাড়ানো হচ্ছে। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, তারা ডিলারদের কাছ থেকেই বেশি দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন, তাই কম দামে বিক্রি করার সুযোগ নেই। আবার ডিলাররা দায় চাপাচ্ছেন আমদানিকারক কোম্পানিগুলোর ওপর।
এই পাল্টাপাল্টি দোষারোপের আড়ালে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, ডিলার, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের একটি অংশ যোগসাজশে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।
এ বিষয়ে জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান সম্প্রতি জানিয়েছেন, জানুয়ারি মাসে এলপিজি আমদানি আগের মাসের তুলনায় বেড়েছে। ফলে সরবরাহ ঘাটতির কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতি পুরোপুরি ব্যবসায়ীদের কারসাজির ফল।
শীতের এই সময়ে পাইপলাইনের গ্যাসের চাপ কম থাকায় এলপিজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। কিন্তু লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে বিপাকে পড়েছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো। রাজধানীর এক গৃহিণী বলেন, “টিভি আর পত্রিকায় যে দাম দেখি, দোকানে গেলে তার কোনো মিল পাই না। বিক্রেতারা যা চায়, তাই দিয়েই গ্যাস কিনতে হচ্ছে।”
বাজার নিয়ন্ত্রণে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে অভিযান ও জরিমানা করা হলেও সাধারণ মানুষের অভিযোগ, এসব অভিযান বেশিরভাগ সময় খুচরা দোকানেই সীমাবদ্ধ থাকে। আমদানিকারক ও বড় ডিলার পর্যায়ে কার্যকর নজরদারি না থাকায় সমস্যার মূল জায়গা অক্ষত থেকে যাচ্ছে।
ভোক্তারা বলছেন, এলপিজির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার সিন্ডিকেটমুক্ত করতে হলে কঠোর মনিটরিং, নির্ধারিত দামে বিক্রি নিশ্চিতকরণ এবং বড় পর্যায়ের কারসাজির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া বিকল্প নেই। নইলে সরকারি ঘোষণা আর বাস্তব বাজারের ব্যবধান আরও বাড়বে, আর ভোগান্তি পোহাতে হবে সাধারণ মানুষকেই।
মাহমুদ কাওসার, নারায়ণগঞ্জ










