ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য ঊর্ধ্বমুখী

ছবি: সংগৃহীত

ইরানকে কেন্দ্র করে নতুন করে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ায় বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। গত কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম প্রায় চার ডলার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

এর আগে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার ঘটনায় তেলের দাম কমলেও, এবার ইরান প্রসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া বক্তব্যের কারণে বাজারে উল্টো প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ফলে গত দুই মাসের মধ্যে তেলের দাম প্রায় সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে।

মঙ্গলবার সকালে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দাঁড়ায় ব্যারেলপ্রতি ৬৪ ডলার ১৫ সেন্ট, আর ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুড বিক্রি হয়েছে ৫৯ ডলার ৭৮ সেন্টে। ৮ ডিসেম্বরের পর এটিই তেলের সর্বোচ্চ মূল্য। পাশাপাশি অন্যান্য তেলের দামেও ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা গেছে।

ওপেকভুক্ত বড় তেল উৎপাদক দেশ ইরানে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী আন্দোলন চলছে। বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রাণঘাতী সহিংসতার অভিযোগ উঠেছে। আন্দোলনের ১৬তম দিন পর্যন্ত সংঘর্ষে অন্তত ৬৪৮ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’।

এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। রয়টার্সের বরাতে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ইরান ইস্যুতে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে ট্রাম্প আজ তার জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে পারেন।

এদিকে ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, যে দেশগুলো ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করবে, তাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের লেনদেনে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। এই ঘোষণার প্রভাব সরাসরি পড়েছে তেলের বাজারে।

নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা সত্ত্বেও ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদক দেশ। দেশটিতে অস্থিরতা আরও বাড়লে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে—এমন উদ্বেগ বাজারে বাড়ছে। ফলে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির প্রভাব তেলের দামে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বার্কলেস এক বিশ্লেষণে জানিয়েছে, ইরানের অস্থিরতার কারণে তেলের দামে ব্যারেলপ্রতি ৩ থেকে ৪ ডলার পর্যন্ত ‘ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি প্রিমিয়াম’ যুক্ত হয়েছে। তাদের মতে, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৬০ ডলার থেকে ৬৪ ডলারে পৌঁছানোর পেছনে মূল কারণ এই ঝুঁকি।

একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলা থেকে অতিরিক্ত অপরিশোধিত তেল সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। মাদুরো ক্ষমতা হারানোর পর ট্রাম্প জানান, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার শর্তে ভেনেজুয়েলার নতুন সরকার যুক্তরাষ্ট্রকে সর্বোচ্চ ৫ কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ করতে পারে।

ভেনেজুয়েলার তেল খাত নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের বড় জ্বালানি কোম্পানিগুলো এগিয়ে থাকলেও, বৈশ্বিক উত্তেজনা পুরো বাজারকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। এর পাশাপাশি ইউক্রেনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার ভোরে রাশিয়া ইউক্রেনের দুটি বড় শহরে হামলা চালিয়েছে, যাতে খারকিভে অন্তত একজন নিহত হয়েছেন।

এদিকে ভূরাজনৈতিক সংকটের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বিষয়ও বাজারে প্রভাব ফেলছে। ট্রাম্প প্রশাসন আবারও ফেডারেল রিজার্ভের সমালোচনা শুরু করায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বেড়েছে। এর ফলে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও তেলের চাহিদা নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও গভীর হয়েছে।

আফরিনা সুলতানা/