আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি সংস্কার বাস্তবায়ন সংক্রান্ত গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। ভোটের আর মাত্র এক মাস বাকি থাকলেও সংসদ নির্বাচন নিয়ে যতটা আলোচনা ও প্রস্তুতি চোখে পড়ছে, গণভোট নিয়ে ততটা দৃশ্যমান প্রচার এখনো দেখা যাচ্ছে না। রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিলেও গণভোটকে কেন্দ্র করে তাদের বড় পরিসরের প্রচার কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকার গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার পক্ষে প্রচারণা চালাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মাঠপর্যায়ে প্রচার চালানোর পাশাপাশি মসজিদের ইমাম, সরকারি দপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং স্থানীয় প্রশাসনকে এতে যুক্ত করা হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ এখনো সাধারণ মানুষের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত প্রভাব ফেলতে পারেনি।
২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন করে। এতে থাকা ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে সংবিধান–সংক্রান্ত ৪৮টি প্রস্তাব নিয়ে এই গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। প্রস্তাবগুলো চারটি প্রশ্নে ভাগ করে ভোট গ্রহণের সিদ্ধান্ত হলেও প্রশ্নগুলো সাধারণ মানুষের জন্য জটিল ও দুর্বোধ্য—এমন অভিযোগ রয়েছে।
গণভোট–সংক্রান্ত জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক আলী রীয়াজ স্বীকার করেছেন, এ ক্ষেত্রে কিছু ঘাটতি রয়েছে। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, আগামী ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে এই দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানেও একরকম ঐক্য দেখা যাচ্ছে না। জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতারা প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে কথা বললেও বিএনপির কিছু নেতা-কর্মী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘না’ ভোটের পক্ষে মত দিচ্ছেন। যদিও দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, বিএনপি সংস্কারের বিপক্ষে নয় এবং ‘না’ বলার কোনো যৌক্তিকতা তারা দেখেন না।
সরকারি উদ্যোগের অংশ হিসেবে সারা দেশে ব্যানার, বিলবোর্ড, লিফলেট বিতরণ, সুপার ক্যারাভান পরিচালনা এবং বিভিন্ন বিভাগে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ইমামদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে, কৃষি বিভাগের মাঠ কর্মকর্তাদের দিয়ে উঠান বৈঠক ও লিফলেট বিতরণের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, অনেক এলাকাতেই মানুষ এখনো গণভোট সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাননি। চট্টগ্রাম, ফেনী ও ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে সীমিত প্রচার দেখা গেলেও সাধারণ ভোটারদের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কম। অনেকেই জানেন না, কীভাবে বা কেন গণভোটে ভোট দিতে হবে।
এদিকে, অন্তর্বর্তী সরকার গণভোটে একটি পক্ষ নিয়ে প্রচার চালাতে পারে কি না—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে আলী রীয়াজ জানিয়েছেন, বিদ্যমান আইন ও সংবিধান অনুযায়ী গণভোটে সংস্কারের পক্ষে ইতিবাচক প্রচার চালাতে সরকারের কোনো আইনি বাধা নেই। তাঁর মতে, বর্তমান সরকার তত্ত্বাবধায়ক নয়; বরং বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন—এই তিনটি ম্যান্ডেট নিয়েই সরকার দায়িত্ব পালন করছে।
সার্বিকভাবে, জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় গণভোট এখনো আলোচনার কেন্দ্রে আসেনি। ভোটের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে গণভোট নিয়ে সচেতনতা ও আগ্রহ বাড়ানোই এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আফরিনা সুলতানা/










