গল্পের শুরুটা হয় ৮ই জানুয়ারি ১৯৭২। কনকনে শীতের ভোরে হিথ্রো বিমানবন্দরে যখন বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী বিমানটি অবতরণ করে, বিশ্ব অবাক হয়ে দেখে একজন মানুষের হিমালয়সম মনোবল। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ প্রটোকল ভেঙে নিজে এসে কারামুক্ত বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানান। হোটেলের সামনে ভিড় জমান হাজার হাজার মানুষ কিন্তু বঙ্গবন্ধুর মন পড়েছিল তাঁর প্রিয় ‘সোনার বাংলা’য়। লন্ডনের আভিজাত্য বা দিল্লির রাজকীয় সংবর্ধনা—কোনো কিছুই তাঁকে আটকে রাখতে পারছিল না। তিনি বারবার বলছিলেন, “আমি আমার মানুষের কাছে ফিরতে চাই।”
১০ জানুয়ারি ১৯৭২। ক্যালেন্ডারের পাতায় স্রেফ একটি তারিখ হলেও বাঙালির হৃদয়ে এটি ছিল এক মহাকাব্যিক মাহেন্দ্রক্ষণ। সেদিন পৌষের কুয়াশা মোড়ানো সকালে ঢাকার আকাশ ছিল অন্যরকম। বাতাসে ভাসছিল এক অদ্ভুত উত্তেজনা। দীর্ঘ নয় মাস যে মানুষটির জন্য কোটি কোটি প্রাণ প্রার্থনা করেছে, যার নাম জপতে জপতে সাধারণ কৃষক থেকে ছাত্ররা রণাঙ্গনে বুক পেতে দিয়েছে, আজ সেই ‘রাজপুত্র’ ফিরছেন তাঁর নিজের রাজ্যে।
পাকিস্তানের লায়ালপুর কারাগারের সেই অন্ধকার প্রকোষ্ঠে যেখানে মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে বঙ্গবন্ধু দিন গুনছিলেন, সেখান থেকে বাঙালির প্রাণের টানে তিনি ফিরে আসছেন—এটি যেন কোনো সিনেমার গল্পকেও হার মানায়।
দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ আর দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে বিজয়ের আনন্দ সেদিন পেয়েছিল সত্যিকারের পূর্ণতা। পাকিস্তানের অন্ধকার কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ফিরে এসেছিলেন তাঁর প্রিয় স্বাধীন স্বদেশে।
ভোর থেকেই তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দরের দিকে জনস্রোত নামতে শুরু করেছিল। শীতের সকালের কুয়াশা ভেদ করে লাঠি, ব্যানার আর ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে ঢাকার রাজপথ। সবার দৃষ্টি আকাশের দিকে—কখন দেখা যাবে সেই রূপালি রঙের ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানটি, যা বহন করে আনছে বাংলাদেশের মুক্তির রূপকারকে।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে তাঁর ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। দীর্ঘ নয় মাস তিনি সেখানে নির্জন কারাবাসে মৃত্যুর প্রহর গুনেছেন কিন্তু বাঙালির অদম্য স্পৃহা আর বিশ্ব জনমতের চাপে পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।
৮ জানুয়ারি ১৯৭২, ভোরে বঙ্গবন্ধু লন্ডন পৌঁছান। সেখানে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে তিনি ঘোষণা করেন, “বাংলাদেশ আজ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র।” এরপর ১০ জানুয়ারি সকালে লন্ডন থেকে বিশেষ বিমানে তিনি ভারতের রাজধানী দিল্লিতে যাত্রাবিরতি করেন। পালাম বিমানবন্দরে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি.ভি. গিরি এবং প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে অভূতপূর্ব সংবর্ধনা জানান। সেখানে এক সংক্ষিপ্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন, “আমার দেশের মানুষের কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য আমি অধীর হয়ে আছি।”
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দুপুর ১টা ৪১ মিনিট। ঢাকার আকাশে দেখা গেল সেই কাঙ্ক্ষিত বিমান। বিমানের চাকা বাংলাদেশের মাটি স্পর্শ করার সাথে সাথে বিমানবন্দর প্রাঙ্গণে উপস্থিত লাখো মানুষের আবেগের বাঁধ ভেঙে যায়। বিমান থেকে বঙ্গবন্ধু যখন হাত নাড়তে নাড়তে বেরিয়ে এলেন, তখন চারিদিকে ধ্বনিত হতে থাকে— ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’। পরনে কালো কোট আর সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা, ক্লান্ত কিন্তু দীপ্ত চোখের সেই সিংহপুরুষকে দেখে কেঁদে ফেলেছিলেন রণাঙ্গন থেকে আসা দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধারাও।
বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দান (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পর্যন্ত পুরো পথটি ছিল লোকে লোকারণ্য। ৫ মাইলের এই পথ পাড়ি দিতে বঙ্গবন্ধুর খোলা ট্রাকটির সময় লেগেছিল প্রায় আড়াই ঘণ্টা। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের পুষ্পবৃষ্টি আর ভালোবাসায় সিক্ত হন তিনি।
বিকালে রেসকোর্স ময়দানে আয়োজিত বিশাল জনসভায় বঙ্গবন্ধু যখন মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ালেন, তখন তাঁর কণ্ঠ ছিল বাষ্পরুদ্ধ। দীর্ঘ নয় মাস পর নিজের দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে তিনি শিশুর মতো কেঁদে ফেললেন। লাখো জনতার উদ্দেশে তিনি বললেন, “আজ আমি বাংলাদেশে ফিরে এসেছি আমার ভাইদের কাছে, আমার মায়েদের কাছে, আমার বোনদের কাছে। বাংলাদেশ আজ স্বাধীন, বাংলাদেশ আজ মুক্ত।”
তিনি আরও বলেন, “আমার জীবনের সাধ আজ পূর্ণ হয়েছে। আমার সোনার বাংলা আজ স্বাধীন হয়েছে।” বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, এই স্বাধীনতা তখনই সার্থক হবে যখন এ দেশের মানুষ পেট ভরে খেতে পাবে এবং সুখে-শান্তিতে বসবাস করবে। তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে সবাইকে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান।
১৬ই ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলেও বাঙালির ঘরের দুয়ারে যেন প্রদীপ জ্বলেনি পূর্ণাঙ্গভাবে। বঙ্গবন্ধুর এই ফিরে আসা ছিল সেই প্রদীপের শিখা। পাকিস্তানের অন্ধকার জেলখানা থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডনে, তারপর দিল্লি হয়ে দেশের মাটিতে পা রাখা—এই পুরো যাত্রাটি ছিল একটি মহাকাব্যের শেষ অধ্যায়।
বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে সেদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতা পূর্ণতা পেয়েছিল। মানুষ বুঝেছিল, এবার তাদের অভিভাবক ফিরে এসেছেন। ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশ গড়ার যে কঠিন পথ, সেই পথে হাঁটার সাহস সেদিন পেয়েছিল পুরো জাতি। আজ এত বছর পরও সেই দিনটির কথা মনে পড়লে শিহরণ জাগে। মনে পড়ে, কীভাবে একজন মানুষ একটি আস্ত জাতির স্বপ্ন আর দীর্ঘশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিলেন।
-এম. এইচ. মামুন










