শীত আসলেই পা ফাটে- কারণ ও প্রতিকার

শীতের হিমেল হাওয়া আর শুষ্ক প্রকৃতি যেমন মনে আনন্দ দেয়, তেমনি শরীরের ত্বকেও ফেলে যায় রুক্ষতার ছাপ। এই সময়ে আমাদের ত্বকের আর্দ্রতা কমে যায়, যার সবচেয়ে বড় শিকার হয় আমাদের পায়ের গোড়ালি। শীতে পা ফাটা একটি সাধারণ কিন্তু যন্ত্রণাদায়ক সমস্যা। সঠিক যত্নের অভাবে এটি কখনো কখনো এতটাই প্রকট হয় যে হাঁটতে কষ্ট হয়, এমনকি রক্তপাতও হতে পারে।
পা ফাটার প্রধান কারণসমূহ
১. আর্দ্রতার অভাব: শীতকালে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ কমে যায়। আমাদের পায়ের নিচে কোনো তৈল গ্রন্থি না থাকায় এই স্থানটি খুব দ্রুত শুষ্ক হয়ে পড়ে এবং চামড়া ফেটে যায়।
২. অপর্যাপ্ত পানি পান: শীতে তৃষ্ণা কম পাওয়ার কারণে আমরা পানি কম খাই। এর ফলে ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা তৈরি হয়, যার প্রভাব পড়ে ত্বকে।
৩. দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা: শক্ত মেঝেতে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকলে পায়ের গোড়ালিতে অতিরিক্ত চাপ পড়ে, যা চামড়া ফাটার অন্যতম কারণ।
৪. অপরিচ্ছন্নতা: বাইরে ধুলোবালি থেকে পা নিয়মিত পরিষ্কার না করলে ত্বকের মৃত কোষ জমে শক্ত হয়ে যায় এবং ফেটে যায়।
৫. জুতার ধরণ: সঠিক মাপের জুতা না পরা বা পেছন খোলা স্যান্ডেল ব্যবহারের ফলে গোড়ালির চামড়া বাইরের বাতাসের সংস্পর্শে এসে দ্রুত শুকিয়ে যায়।
৬. শারীরিক সমস্যা: থাইরয়েড, ডায়াবেটিস বা ভিটামিনের অভাব থাকলেও পা ফাটার প্রবণতা বাড়ে।
পা ফাটা প্রতিরোধের উপায়
প্রতিরোধ সব সময়ই প্রতিকারের চেয়ে উত্তম। শীতের শুরু থেকেই কিছু নিয়ম মেনে চললে পা ফাটা এড়িয়ে চলা সম্ভব:

পা ঢাকা রাখা: বাইরে বের হলে অবশ্যই মোজা ও বন্ধ জুতা ব্যবহার করুন। এটি ধুলোবালি ও সরাসরি বাতাস থেকে পা রক্ষা করবে।

নিয়মিত ময়েশ্চারাইজিং: প্রতিদিন গোসলের পর এবং রাতে ঘুমানোর আগে পায়ে ভালো মানের লোশন বা পেট্রোলিয়াম জেলি ব্যবহার করুন।

প্রচুর পানি পান: ত্বককে ভেতর থেকে সজীব রাখতে দিনে অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি পান করার অভ্যাস বজায় রাখুন।

ঘরোয়া প্রতিকার ও চিকিৎসা
যদি পা ফেটেই যায়, তবে চিন্তার কিছু নেই। ঘরোয়া উপায়ে খুব সহজেই এর যত্ন নেওয়া সম্ভব:
 কুসুম গরম পানির সেঁক: একটি গামলায় হালকা গরম পানি নিয়ে তাতে সামান্য লবণ ও শ্যাম্পু মিশিয়ে ১০-১৫ মিনিট পা ডুবিয়ে রাখুন। এরপর পিউমিস স্টোন বা ফুট স্ক্রাবার দিয়ে আলতো করে মরা চামড়া ঘষে তুলে ফেলুন। শেষে পা শুকিয়ে ভালো করে ময়েশ্চারাইজার লাগান।
 নারকেল তেল ও মোম: পুরানো আমলের এই পদ্ধতিটি বেশ কার্যকর। সামান্য মোম গলিয়ে তাতে নারকেল তেল মিশিয়ে ফাটা জায়গায় লাগিয়ে সারা রাত রাখুন। কয়েক দিনেই পা নরম হয়ে আসবে।
 গ্লিসারিন ও গোলাপ জল: গ্লিসারিন ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে অতুলনীয়। সমপরিমাণ গ্লিসারিন ও গোলাপ জল মিশিয়ে রাতে ঘুমানোর আগে পায়ে ম্যাসাজ করুন।
কলার মাস্ক: একটি পাকা কলা চটকে পায়ের ফাটা জায়গায় লাগিয়ে রাখুন ২০ মিনিট। এরপর ধুয়ে ফেলুন। কলার ভিটামিন বি ও পটাশিয়াম ত্বক পুনর্গঠনে সাহায্য করে।
অ্যালোভেরা জেল: অ্যালোভেরায় রয়েছে নিরাময়কারী গুণ। পা পরিষ্কার করে অ্যালোভেরা জেল লাগিয়ে মোজা পরে ঘুমান। এটি ত্বকের রুক্ষতা দূর করবে দ্রুত।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন
ঘরোয়া পদ্ধতিতে যদি কাজ না হয় এবং পায়ের ফাটল দিয়ে রক্ত পড়ে বা পুঁজ দেখা দেয়, তবে দেরি না করে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ এটি কোনো ছত্রাকজনিত সংক্রমণের সংকেত হতে পারে।
* শীতে ডায়াবেটিস রোগীদের পা ফাটা’ গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে
কারণ এতে ত্বক ফেটে জীবাণু প্রবেশ করে ইনফেকশন, আলসার এবং গুরুতর জটিলতা (যেমন অঙ্গহানি) হতে পারে, যা স্নায়ু ক্ষতির কারণে রোগীর পক্ষে বোঝা কঠিন। তাই শুষ্কতা ও ফাটা রোধে উষ্ণ জল, ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার এবং প্রতিদিন পা পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি, নইলে সাধারণ ফাটা থেকেও মারাত্মক বিপদ হতে পারে।

পা ফাটা কোনো গুরুতর রোগ নয়, বরং এটি অবহেলার ফল। সামান্য সচেতনতা আর প্রতিদিনের ১০ মিনিটের যত্ন আপনার পা-কে রাখতে পারে কোমল ও সুন্দর। তাই এবারের শীতে নিজের পায়ের প্রতি একটু বাড়তি নজর দিন এবং প্রাণ খুলে হাঁটুন আগামীর পথে।

মামুন/