প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষণা করেছেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে দেশের ইতিহাসের ‘সর্বকালের সেরা নির্বাচন’। তবে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ও ঋণখেলাপিদের আইনি মারপ্যাঁচে প্রার্থিতা বৈধ করার চিত্র ভিন্ন এক শঙ্কার জন্ম দিচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, শত শত কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ অনাদায়ী রেখে এবং বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণকারীরা সংসদে গিয়ে কতটা জনকল্যাণ নিশ্চিত করতে পারবেন?
ইসি সূত্রে জানা গেছে, ৩০০ আসনে ১ হাজার ৮৪২টি মনোনয়নপত্র বৈধ এবং ৭২৩টি বাতিল করা হয়েছে। বাতিলের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে ৬০০ জন প্রার্থী আপিল করেছেন, যার শুনানি আজ থেকে শুরু হয়ে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে।
নির্বাচনী ক্যালেন্ডার একনজরে:
আপিল শুনানি: ১০ – ১৮ জানুয়ারি
প্রার্থিতা প্রত্যাহার: ২০ জানুয়ারি
প্রতীক বরাদ্দ: ২১ জানুয়ারি
ভোটগ্রহণ: ১২ ফেব্রুয়ারি
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি তালিকা অনুযায়ী, ১১৩ জন ঋণখেলাপি মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো—৩১ জন ঋণখেলাপি আইনি মারপ্যাঁচে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে তাদের প্রার্থিতা বৈধ করে ফেলেছেন। এদের মধ্যে বিএনপির ১৫ জন, স্বতন্ত্র ১১ জন এবং জাতীয় পার্টি ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীও রয়েছেন। অন্যদিকে, ঋণখেলাপির দায়ে সরাসরি বাতিল হয়েছে ৮২ জনের মনোনয়নপত্র। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
বিএনপি: ৩ জন (যশোর-৪, কুমিল্লা-১০ ও চট্টগ্রাম-১১)।
জামায়াত: ২ জন (যশোর-২ ও ঢাকা-২)।
জাতীয় পার্টি: ১০ জন (নীলফামারী-৩, কিশোরগঞ্জ-৩ সহ বিভিন্ন আসন)।
ইসলামী আন্দোলন: ৬ জন।
স্বতন্ত্র: ২৮ জন।
সংবিধানের ৬৬ ধারা অনুযায়ী, বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ না করলে কেউ সংসদ সদস্য হতে পারেন না। এবারের নির্বাচনে বেশ কয়েকজন দ্বৈত নাগরিকের মনোনয়নপত্র বাতিল ও স্থগিত হয়েছে। বাতিল হওয়াদের মধ্যে রয়েছেন শেরপুর-২ আসনে বিএনপির ইঞ্জিনিয়ার ফাহিম চৌধুরী এবং কুমিল্লা-৩ ও কুড়িগ্রাম-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী। তবে সিলেট অঞ্চলের তিনজন প্রার্থী (এম এ মালিক, এহতেশামুল হক ও জাহিদুর রহমান) যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ত্যাগের হলফনামা জমা দেওয়ায় তাদের নিয়ে সিদ্ধান্ত এখনো পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর ড. মাহবুব উল্লাহ ইনকিলাবকে বলেন, “যারা কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ফেরত দেয় না, তারা দেশ ও জাতির উপকারে আসতে পারে না। আরপিও অনুযায়ী, নির্বাচিত হওয়ার পরও যদি কারো ঋণখেলাপি হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়, তবে ইসি তার সদস্যপদ বাতিল করতে পারে। এখন দেখার বিষয় ইসি আইন প্রয়োগে কতটা কঠোর হয়।”
অনুরূপ সুর গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকির কণ্ঠেও। তিনি বলেন, “ব্যাংক লুটপাটকারী ও অর্থপাচারকারীদের ব্যাপারে কমিশনকে কঠোর হতে হবে। আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে তারা যদি নির্বাচনে ঢুকে পড়ে, তবে জনমনে আস্থার সংকট তৈরি হবে।”
বিগত সংসদগুলোতে ব্যবসায়ীদের আধিপত্য (৭২-৭৫ শতাংশ) নিয়ে জনমনে আগে থেকেই অসন্তোষ ছিল। এবার যদি ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকরা জনগণের রায়ের চেয়ে টাকার জোরে ক্ষমতায় আসেন, তবে ‘সর্বকালের সেরা সংসদ’ গঠন হোঁচট খেতে পারে। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ ও কঠোর আইন প্রয়োগই এখন সাধারণ ভোটারদের একমাত্র প্রত্যাশা।
-এম. এইচ. মামুন










