রাজধানীতে গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।দিনভর অপেক্ষা করেও লাইনে গ্যাস আসছে না। মিলছে না এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার। সব মিলে সংকট যেন দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে।এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত মূল্যের দ্বিগুণ দাম দিয়েও খুচরা বাজারে সিলিন্ডার মিলছে না। কবে নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কেউই স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারছেন না। এর মধ্যেই এলপিজি বিক্রিতে কমিশন বাড়ানো, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) একতরফা মূল্য নির্ধারণ বন্ধসহ ছয় দফা দাবিতে ব্যবসায়ীদের ডাকা ধর্মঘটে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। পরে বিইআরসির সঙ্গে বৈঠকের পর এলপিজি ব্যবসায়ীরা ধর্মঘট প্রত্যাহার করলেও সংকটের প্রভাব রাজধানীর গ্রাহক পর্যায়ে রয়ে গেছে। সপ্তাহজুড়ে চলা এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। হঠাৎ করে সংকট তৈরি হওয়ায় অনেক বাসায় রান্না বন্ধ হয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে কেউ হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে খাবার কিনে খাচ্ছেন, আবার কেউ কেরোসিন কিংবা ইনডাকশন চুলা দিয়ে কোনোমতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন। শুক্রবার রাজধানীর মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডির শংকর, বাসাবোসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে।
মোহাম্মদপুরের শেরশাহ সুরী রোডের একটি হোটেলে গিয়ে দেখা যায়, সকাল ৮টার ব্যস্ত সময়ে হোটেলটি বন্ধ। সাধারণত এই হোটেলে শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষ কম দামে খাবার খেতে আসেন। হোটেলের পাশের একটি টং দোকানের দোকানদার জানান, গ্যাসের অভাবে হোটেলটি বন্ধ রয়েছে। নিজের দোকানের চুলার দিকে ইশারা করে তিনি বলেন, ‘আমার চুলাও বন্ধ। সিলিন্ডার নাই। চা বিক্রি করতে পারতেছি না, অথচ এইটাই আমার সবচেয়ে লাভের জিনিস।’ একই ধরনের কথা বললেন টাউন হল কাঁচাবাজার এলাকার টং দোকানদার লাবু মিয়া। পাশের দুটি বন্ধ টং দোকান দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘২৫০০ টাকা দিয়াও সিলিন্ডার পাওয়া যায় না। কোম্পানিগুলো নাকি সিলিন্ডার ছাড়ে না। আমার দোকানের গ্যাস আজ শেষ হয়ে যাবে। কাল থেকে আমিও চা বিক্রি বন্ধ রাখমু। এখন কী করমু? গ্যাস না পাইলে কি জান দিয়া দিমু?’রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এমন অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ। সংকট দ্রুত নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হলে এই ভোগান্তি আরও বাড়বে এমন আশঙ্কাই করছেন তারা।
গ্যাস সংকট এখন আর সাময়িক কোনো সমস্যা নয়, এটি নগরজীবনের নিত্যদিনের দুর্ভোগে রূপ নিয়েছে। লাইনের গ্যাসে স্বল্পচাপ, পাইপলাইন মেরামতের কারণে সরবরাহে বিঘ্ন এবং বাজারে এলপিজির সংকট ও চড়া দাম এই ত্রিমুখী সংকটে রাজধানীর লাখো পরিবার চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছে। রান্নাঘর অচল হয়ে পড়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে নগরবাসীর।শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা গৃহিণী কানিজ আক্তার বলেন, রান্নার নির্দিষ্ট সময় বলে কিছু নেই। গ্যাস এলে তখনই হাঁড়ি বসাতে হয়। মাঝরাতে রান্না করে ফ্রিজে রেখে দিচ্ছি। পরিবার নিয়ে এভাবে চলা খুব কষ্টকর।
একই এলাকার আরেক বাসিন্দা জানান, শিশু ও বয়স্ক সদস্যদের খাবারের করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে কর্মজীবী পরিবারগুলো। সকালে রান্না করতে না পেরে অনেকেই বাধ্য হয়ে হোটেল বা রাস্তার দোকানের খাবারের ওপর নির্ভর করছেন। এতে একদিকে যেমন বাড়ছে দৈনন্দিন খরচ, অন্যদিকে স্বাস্থ্য ঝুঁকির আশঙ্কাও বাড়ছে। মুস্তাফিজ নামে মালিবাগের এক বেসরকারি চাকরিজীবী বলেন, গ্যাস না থাকলেও মাস শেষে বিল ঠিকই আসে। রান্না করতে না পেরে বাইরে খেতে হচ্ছে, সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। লাইনের গ্যাস না পেয়ে অনেক পরিবার বিকল্প হিসেবে এলপিজি চুলা ব্যবহার শুরু করলেও সেখানেও মিলছে না স্বস্তি। বাজারে এলপিজির সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি সরকারি দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে।
যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম বলেন, সরকার নির্ধারিত দামের কথা বললে দোকানদার গ্যাসই দিতে চায় না। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে দুই হাজার টাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে। এই অবস্থায় এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি সাময়িকভাবে সারাদেশে এলপিজি বিক্রি ও সরবরাহে ধীরগতি এনেছে। এতে জনদুর্ভোগ আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এলপিজির ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর পাশাপাশি হোটেল, রেস্তোরাঁ, চায়ের দোকান ও ক্ষুদ্র খাবার ব্যবসায়ীরাও চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।
মামুন/










