দেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে অন্যতম কলঙ্কিত অধ্যায় সাগর সরোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ড। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ১৪ বছর পূর্ণ হতে চললেও রহস্য উদ্ঘাটনে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। সর্বশেষ গঠিত উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গত ১৫ মাসেও কোনো কূলকিনারা করতে না পারায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলো এখন বিচারের আশাই ছেড়ে দিয়েছে।
তদন্তের ব্যর্থতার মহাকাব্য: ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ফ্ল্যাটে মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরোয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ঘটনার পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিরা ধরা পড়বে’। কিন্তু সেই ৪৮ ঘণ্টা গড়িয়ে আজ ১৪ বছরে ঠেকেছে।
মামলাটি প্রথমে শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ, এরপর ডিবি এবং দীর্ঘ ১১ বছর র্যাব তদন্ত করেছে। র্যাব থাকাকালীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২১ জনের ডিএনএ নমুনা পরীক্ষা করানো হয় এবং সেখানে দুইজনের পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া গেলেও কোনো খুনি শনাক্ত হয়নি। এরপর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে হাইকোর্টের নির্দেশে পিবিআই প্রধানের নেতৃত্বে গঠিত হয় উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স। কিন্তু গত ১৫ মাসে সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ ও আলামত যাচাই ছাড়া তদন্তের কোনো নতুন দিক উন্মোচিত হয়নি।
টাস্কফোর্সের বর্তমান অবস্থা: পিবিআই প্রধান ও টাস্কফোর্সের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. মোস্তফা কামাল বলেন, “আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মামলাটি তদন্ত করছি। খুনিরা বাসার পূর্ব দিক দিয়ে জানালার গ্রিল ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেছিল—এটি আমরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিশ্চিত হয়েছি।” তবে খুনিরা কারা এবং কেন তাদের শনাক্ত করা যাচ্ছে না, সে বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি।
নবাবপুরের সেই জরাজীর্ণ ঘরে দীর্ঘশ্বাস: গত শুক্রবার সরেজমিনে পুরান ঢাকার নবাবপুর রোডে সাগরের পৈতৃক নিবাসে গিয়ে দেখা যায় এক করুণ দৃশ্য। একতলা এক জরাজীর্ণ ঘরে বসবাস করছেন সাগরের মা সালেহা মনির। সাংবাদিক পরিচয় শুনতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। দীর্ঘ ১৪ বছরের অপেক্ষার ক্লান্তি তার চোখেমুখে।
আবেগতাড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমার কাছে সন্দেহ হচ্ছে কোনোদিন খুনিরা গ্রেপ্তার হবে কিনা। জন্মদাতা মা হিসেবে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগ পর্যন্ত বিচার চেয়ে যাব।” তিনি জানান, জরাজীর্ণ ভবনটি সংস্কারের স্বপ্ন ছিল সাগরের। ডয়চে ভেলে থেকে টাকা পেলে ভবনটি মেরামত করার কথা মা-কে দিয়েছিলেন সাগর। কিন্তু ঘাতকের বুলেটে সেই স্বপ্ন মাটি চাপা পড়েছে। বৃষ্টির দিনে এখন ঘরে পানি ঢোকে, কিন্তু মায়ের কষ্টের কথা শোনার কেউ নেই।
মেঘের বড় হওয়া ও অমীমাংসিত প্রশ্ন: হত্যাকাণ্ডের রাতে বাসায় থাকা এই দম্পতির ৫ বছর বয়সী একমাত্র শিশুসন্তান মেঘের বয়স এখন ১৯ বছর। অবুঝ শিশুটি সেদিন কিছুই বলতে পারেনি, কিন্তু আজ তরুণ মেঘের চোখের সামনেও বিচারহীনতার সংস্কৃতি বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। মামলার বাদী রুনির ভাই নওশের আলম রোমান বলেন, “ক্লুলেস বহু চাঞ্চল্যকর মামলার সমাধান আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুততম সময়ে করে দিলেও ব্যতিক্রম শুধু এই মামলাটি। এর পেছনে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র লুকায়িত রয়েছে বলে আমাদের আশঙ্কা।”
হাইকোর্ট ইতিপূর্বে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ১২৩ বার সময় বাড়িয়েছে। সাংবাদিক সমাজসহ বিভিন্ন মহলের ক্রমাগত দাবি সত্ত্বেও তদন্তে দৃশ্যমান কোনো ফলাফল না আসা রাষ্ট্রের বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।