নারায়ণগঞ্জবাসীর দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো

উন্নয়ন সম্ভাবনার আড়ালে বাড়ছে নাগরিক দুর্ভোগ ও নিরাপত্তাহীনতা । নারায়ণগঞ্জ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পনগরী। রাজধানী ঢাকার সন্নিকটে অবস্থিত এই জেলা পোশাক শিল্প, পাটকল, ব্যবসা-বাণিজ্য ও নৌপথের কারণে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। তবে সম্ভাবনার এই শহরটি দীর্ঘদিন ধরে নানা নাগরিক সমস্যায় জর্জরিত। উন্নয়ন প্রকল্প, প্রশাসনিক উদ্যোগ ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তব জীবনে নারায়ণগঞ্জবাসীর নিত্যদিনের ভোগান্তি কমেনি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

জলাবদ্ধতা ও ড্রেনেজ সংকট: বছরের পর বছর অমীমাংসিত

নারায়ণগঞ্জবাসীর সবচেয়ে পুরোনো ও বড় সমস্যাগুলোর একটি জলাবদ্ধতা। সামান্য বৃষ্টি হলেই ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, খানপুর, দেওভোগ, চাষাঢ়া, কদমরসুল ও শিবু মার্কেটসহ বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে চলে যায়। অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল দখল এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বছরের পর বছর এই সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। অনেক এলাকায় বৃষ্টির পানি নামতে দুই থেকে তিন দিন সময় লাগে, ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়িতে মারাত্মক ক্ষতি হয়।

যানজট ও সড়ক অব্যবস্থাপনা

নারায়ণগঞ্জ শহরে যানজট এখন নিত্যদিনের দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। চাষাঢ়া, ২ নম্বর রেলগেট, শিমরাইল, সাইনবোর্ড, হাজীগঞ্জ ও ফতুল্লা এলাকায় দিনের বড় একটি সময় যান চলাচল স্থবির থাকে। সংকীর্ণ সড়ক, অবৈধ পার্কিং, ফুটপাত দখল এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। জরুরি রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত অনেক সময় যানজটে আটকে পড়ছে।

ছিনতাই ও পথ অপরাধ বৃদ্ধি: নগরজীবনে নতুন আতঙ্ক

সাম্প্রতিক সময়ে নারায়ণগঞ্জে ছিনতাই ও পথ অপরাধ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর ও গভীর রাতে চাষাঢ়া, ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, শিমরাইল, কদমরসুল, রেলস্টেশন ও বাসস্ট্যান্ডকেন্দ্রিক এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা নিয়মিত ঘটছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। মোবাইল ফোন, টাকা ও ব্যাগ ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন পথচারী, শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীরা।

অনেক ক্ষেত্রে ছিনতাইকারীরা মোটরসাইকেলে এসে মুহূর্তেই ছিনতাই করে পালিয়ে যাচ্ছে। পর্যাপ্ত সড়কবাতির অভাব, পুলিশের টহল দুর্বলতা এবং অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত ও বিচারের অভাব এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে বলে মনে করছেন নাগরিকরা। ফলে সাধারণ মানুষ বিশেষ করে নারী ও বয়স্করা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

শিল্পদূষণ ও পরিবেশ সংকট

শিল্পনগরী হওয়ায় নারায়ণগঞ্জে পরিবেশ দূষণ একটি বড় সমস্যা। সিদ্ধিরগঞ্জ ও ফতুল্লা এলাকায় অবস্থিত ডাইং, ওয়াশিং ও রাসায়নিক কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্যে শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গা নদী মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। বাতাস ও পানির দূষণের ফলে চর্মরোগ, শ্বাসকষ্টসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও প্রভাবশালী চক্র

নারায়ণগঞ্জে দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির অভিযোগ রয়েছে। অনেক এলাকায় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা চক্রের কারণে ভয়ে থাকেন। যদিও মাঝে মাঝে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান দেখা যায়, তবে স্থায়ী সমাধান হয়নি বলে মনে করেন ভুক্তভোগীরা।

ফুটপাত দখল ও জনপরিসরের সংকট

শহরের অধিকাংশ ফুটপাত দখল হয়ে থাকায় পথচারীদের সড়কে নেমে হাঁটতে হয়। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য এটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সীমাবদ্ধতা

নারায়ণগঞ্জে সরকারি হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও সেবার মান নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে। সরকারি হাসপাতালে জনবল, শয্যা ও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও শ্রেণিকক্ষ সংকট ও মানসম্মত শিক্ষার অভাবের অভিযোগ রয়েছে।

অপরিকল্পিত নগরায়ন

নারায়ণগঞ্জ শহর অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠায় আবাসিক, শিল্প ও বাণিজ্যিক এলাকা একসঙ্গে মিশে গেছে। খাল-বিল ভরাট, উন্মুক্ত জায়গার অভাব এবং সবুজায়নের ঘাটতি নগরজীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

নাগরিক প্রত্যাশা

নারায়ণগঞ্জবাসীর দাবি, শুধু উন্নয়ন প্রকল্পের ঘোষণা নয়—বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। জলাবদ্ধতা নিরসন, যানজট কমানো, ছিনতাই ও অপরাধ দমন, পরিবেশ রক্ষা এবং নাগরিক সেবার মান উন্নয়নে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জ একদিকে সম্ভাবনাময় শিল্পনগরী, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তাহীনতায় জর্জরিত জনপদ। সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধানেই নির্ভর করছে এই শহরের ভবিষ্যৎ ও নাগরিকদের জীবনমান।

মাহমুদ কাওসার, নারায়ণগঞ্জ