দেশের অন্যতম শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত বরেন্দ্র অঞ্চলের জেলাগুলোতে (রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোর) আশঙ্কাজনক হারে কমছে আবাদি জমি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্যমতে, গত ১৭ বছরে এই চার জেলায় প্রায় ৯০ হাজার হেক্টর তিন ফসলি জমি নষ্ট হয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া এবং অপরিকল্পিত নগরায়ন ও পুকুর খনন এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক বিধান চন্দ্র দাস বলেন, খরা, পানির স্তর নেমে যাওয়া এবং মাটির উর্বরতা হ্রাসের কারণে কৃষকরা বাধ্য হয়ে কৃষিজমিকে ফলের বাগান অথবা বসতবাড়িতে রূপান্তর করছেন। এছাড়া বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য তিন ফসলি জমিতে খনন করা হচ্ছে বিশাল বিশাল মাছের পুকুর।
অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী, শুধু রাজশাহী জেলায় ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ১৬,১৫৯ হেক্টর আবাদি জমি হারিয়ে গেছে। তবে অধ্যাপক বিধান দাসের অভিযোগ, অবৈধ ও অনিবন্ধিত পুকুরের সংখ্যা বিবেচনায় নিলে এই ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি হবে। গত অর্থবছর রাজশাহীতে ৫২,০৬৩ টন চাহিদার বিপরীতে ৮৪,৮০৩ টন মাছ উৎপাদিত হয়েছে, যা এই অঞ্চলে মাছ চাষের ব্যাপক প্রসারের প্রমাণ দেয়।
বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজেনাস নলেজ (বারসিক)-এর আঞ্চলিক সমন্বয়কারী শহিদুল ইসলাম জানান, অর্থনৈতিক লাভের আশায় ধান চাষের বদলে কৃষকরা মাছ চাষের দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু অপরিকল্পিত এই পুকুর খনন মাটির ওপরের উর্বর অংশ (Topsoil) সরিয়ে দেয় এবং নিচের অনুর্বর মাটি ছড়িয়ে দেয়। এতে পার্শ্ববর্তী জমিও চাষাবাদের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। এছাড়া যত্রতত্র পুকুর খননের ফলে প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং শস্য রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।
আইন অনুযায়ী, আবাদি জমিতে পুকুর খনন করতে হলে জেলা প্রশাসকের অনুমতি এবং কৃষি কর্মকর্তার প্রত্যয়ন প্রয়োজন। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। রাজশাহীর জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আফিয়া আখতার জানিয়েছেন, অবৈধ পুকুর খনন বন্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট ও নৈশকালীন অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ডিএই-এর অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান মনে করেন, এই সংকট মোকাবিলায় প্রশাসন ও কৃষি সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের সমন্বিত প্রচেষ্টা জরুরি।
নীতিনির্ধারকরা সতর্ক করেছেন যে, আবাদি জমি রক্ষার জন্য কঠোর নজরদারি এবং ভূমি ব্যবহারের সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
বাসস/এম.এইচ.মামুন










