সারা দেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে প্রাণঘাতী নিপাহ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব। গত ২৫ বছরে দেশের ৩৫টি জেলায় এই ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। পরিস্থিতি আরও আশঙ্কাজনক করে তুলেছে এর পরিবর্তনের ধরন। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, গত দুই বছরে দেশে নিপাহ আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুহার ছিল শতভাগ। গতকাল বুধবার আইইডিসিআর মিলনায়তনে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরা হয়।
আইইডিসিআর-এর বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শারমিন সুলতানা জানান, সাধারণত ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল মাসকে নিপাহর মৌসুম ধরা হলেও ২০২৫ সালের আগস্টেও রোগী শনাক্ত হয়েছে। নওগাঁর ৮ বছরের এক শিশুর শরীরে এই ‘অ-মৌসুমি’ সংক্রমণ ধরা পড়ে, যা নিপাহ ছড়ানোর নতুন উৎস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, খেজুরের রসের বাইরে বাদুড়ের আধা-খাওয়া ফল (কালোজাম, খেজুর, আম) খাওয়ার মাধ্যমে এই ভাইরাস বছরজুড়ে ছড়াতে পারে।
বিশ্বজুড়ে নিপাহ ভাইরাসে গড় মৃত্যুহার ৭২ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে আক্রান্ত সবারই মৃত্যু হয়েছে। আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন জানান, ২০০১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে মোট ৩৪৭ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ২৪৯ জনের। ২০২৪ সালে ৫ জন এবং ২০২৫ সালে ৪ জন আক্রান্তের প্রত্যেকেই মারা গেছেন।
বর্তমানে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৩৫টিতেই নিপাহ ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ফরিদপুর, রাজবাড়ী, নওগাঁ ও লালমনিরহাট জেলায় সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। গত বছর প্রথমবারের মতো দ্বীপ জেলা ভোলায় নিপাহ রোগী শনাক্ত হওয়াকে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
সভায় জানানো হয়, খেজুরের রস খাওয়ার ২ থেকে ২৮ দিনের মধ্যে এই ভাইরাসের লক্ষণ প্রকাশ পায়। মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের ক্ষেত্রে সময় লাগে ৯ থেকে ১১ দিন। আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে প্রায় ২৮ শতাংশ ক্ষেত্রে সরাসরি অন্যদের মাঝে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ে, যা স্বাস্থ্যকর্মী ও পরিবারের সদস্যদের জন্য উচ্চঝুঁকি তৈরি করে।
রস উৎসবে ‘না’: কাঁচা খেজুরের রস পান করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে। অনলাইনেও কাঁচা রস কেনা যাবে না।
আধা-খাওয়া ফল বর্জন: বাদুড় বা পাখির খাওয়া ফল খাওয়া যাবে না।
আইসোলেশন: কাঁচা রস খাওয়ার পর কোনো লক্ষণ দেখা দিলে রোগীকে অন্তত ২৮ দিন আইসোলেশনে রাখতে হবে।
আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. তাহমিনা শিরীন বলেন, “নিপাহ এখন শুধু শীত বা খেজুরের রসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আমরা পিঠা উৎসবকে উৎসাহিত করব, কিন্তু রস উৎসবকে নয়।” কার্যকর কোনো টিকা বা চিকিৎসা না থাকায় সচেতনতাই এখন এই ভাইরাস মোকাবিলার একমাত্র পথ।
-এম. এইচ. মামুন










