আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ধারণে মূল চাবিকাঠি হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে দেশের তরুণ ভোটাররা। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) হালনাগাদ তথ্যমতে, বর্তমানে ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সী ভোটারের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৪ কোটি। বিশাল এই জনশক্তি আগামী দিনে রাজনীতির সমীকরণ বদলে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। ডিজিটাল প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত এবং সচেতন এই প্রজন্ম প্রার্থীদের যোগ্যতা বিচারে অত্যন্ত গুরুত্ব দেবে, যা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফলে প্রধান প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে।
জাতীয় যুবনীতি ২০১৭ অনুযায়ী ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের যুব হিসেবে গণ্য করা হলেও নির্বাচন কমিশনের উপাত্ত বিশ্লেষণে ৩৩ বছর বয়স পর্যন্ত ভোটারদের ‘তরুণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইসির হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সী মোট ভোটারের সংখ্যা ৪ কোটি ৩৩ লাখ ৪৬ হাজার ৪২১ জন।
তরুণ ভোটারদের পাশাপাশি নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলবেন ২ কোটির কাছাকাছি প্রবীণ ভোটার (ষাটোর্ধ্ব )। ইসির তথ্যমতে, ৬০ বছরের বেশি বয়সী ভোটারের সংখ্যা ১ কোটি ৯৩ লাখ ৫১ হাজার ৯৯৪ জন। ড. শাহজাহান মনে করেন, “নির্বাচনের প্রকৃত মোড় ঘুরবে তখনই, যখন কোনো দল তরুণদের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা এবং প্রবীণদের আস্থার মধ্যে একটি সঠিক ভারসাম্য তৈরি করতে পারবে।” গত বুধবার (৭ জানুয়ারি) নির্বাচন কমিশনের আওতাধীন জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের ভোটার তালিকার হিসাব থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
তরুণরাই কেন হতে পারে ‘কিংমেকার’
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, তরুণ ভোটারদের প্রত্যাশা প্রথাগত রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে একটু ভিন্নমুখী। তারা কর্মসংস্থান, মানসম্মত শিক্ষা এবং আধুনিক নাগরিক সুযোগ-সুবিধার ওপর অধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন। এই সাড়ে ৪ কোটি ভোটার যদি ঐক্যবদ্ধভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন, তবে যেকোনো দলের জয়-পরাজয় নির্ধারণে তারাই মুখ্য ভূমিকা পালন করবেন। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোও এখন তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে তরুণদের প্রাধান্য দিয়ে নানামুখী কর্মসূচি হাতে নিচ্ছে; মূলত এই বিশাল জনশক্তিকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে আগামীর নির্বাচনি রণকৌশল।
ইসির হালনাগাদ তথ্য ও পরিসংখ্যান
ইসির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোটার রয়েছে ২৬ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে। এই দুই সংখ্যা মিলিয়ে প্রায় আড়াই কোটি ভোটার রয়েছে।
বয়সভিত্তিক তরুণ ভোটার বিন্যাস:
১৮-২১ বছর: ৮৫ লাখ ৩১ হাজার ৫৩৮ জন
২২-২৫ বছর: ১ কোটি ১৯ লাখ ৬২ হাজার ১০৬ জন
২৬-২৯ বছর: ১ কোটি ২১ লাখ ৬৬ হাজার ১৬২ জন
৩০-৩৩ বছর: ১ কোটি ৬ লাখ ৮৬ হাজার ৬১৫ জন
প্রবীণ ও মধ্যবয়সী ভোটারের চিত্র
তরুণদের পাশাপাশি প্রবীণ ভোটারদের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। ইসি অনুযায়ী, ৬০ বছরের বেশি বয়সী ভোটারের সংখ্যা ১ কোটি ৯৩ লাখ ৫১ হাজার ৯৯৪ জন। এছাড়া অন্যান্য বয়সীরা হলেন:
৩৪-৪১ বছর: ২ কোটি ৫৩ লাখ ৩৩ হাজার ২০৫ জন
৪২-৪৯ বছর: ২ কোটি ১৫ লাখ ৬২ হাজার ৭৬৫ জন
৫০-৬০ বছর: ১ কোটি ৯৫ লাখ ৭৭ হাজার ৬৯১ জন
ড. শাহজাহান বলেন, প্রবীণরা সাধারণত ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার বিষয়ে বেশি স্থিতিশীল। নির্বাচনের প্রকৃত মোড় ঘুরবে তখনই, যখন কোনো দল তরুণদের উচ্ছ্বাস এবং প্রবীণদের আস্থার মধ্যে একটি সঠিক ভারসাম্য তৈরি করতে পারবে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২৬ থেকে ২৯ বছর বয়সী ভোটারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তরুণদের এই বিশাল উপস্থিতি রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য যেমন সুযোগ, তেমনি বড় চ্যালেঞ্জও।
অঞ্চলভিত্তিক ভোটার বিন্যাস
অঞ্চল হিসেবে ভোটার সংখ্যার শীর্ষে রয়েছে ঢাকা এবং সর্বনিম্ন ফরিদপুর।
ঢাকা অঞ্চল: ১ কোটি ৮৩ লাখ ৪৪ হাজার ৯৬৫ জন
রাজশাহী অঞ্চল: ১ কোটি ৬৩ লাখ ৭৮ হাজার ৮০ জন
ময়মনসিংহ অঞ্চল: ১ কোটি ৬৩ লাখ ৯ হাজার ২৭১ জন
কুমিল্লা অঞ্চল: ১ কোটি ৫৭ লাখ ৬৮ হাজার ৫০ জন
খুলনা অঞ্চল: ১ কোটি ৪২ লাখ ৩৫ হাজার ৬১০ জন
রংপুর অঞ্চল: ১ কোটি ৪১ লাখ ৮৪ হাজার ১২২ জন
চট্টগ্রাম অঞ্চল: ৯৯ লাখ ১১ হাজার ৩২০ জন
সিলেট অঞ্চল: ৮৪ লাখ ৪৫ হাজার ৮২২ জন
বরিশাল অঞ্চল: ৭৯ লাখ ৮১ হাজার ১২৭ জন
ফরিদপুর অঞ্চল: ৬১ লাখ ৫৩ হাজার ৫২৬ জন
এ বিষয়ে কী বলছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ
এ বিষয়ে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ, সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট ও অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ড. মো. শাহজাহান বলেন, “বাংলাদেশের বর্তমান জনতাত্ত্বিক কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়— এবারের নির্বাচনে তরুণ ভোটাররাই প্রকৃত কিংমেকার হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছেন। মোট ভোটারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই তরুণ, যা যেকোনো রাজনৈতিক দলের ভাগ্য বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।”
তিনি আরও বলেন, “এই প্রজন্মটি তথ্য-প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহে বেড়ে উঠেছে। তারা প্রথাগত রাজনৈতিক স্লোগানের চেয়ে কর্মসংস্থান, স্বচ্ছতা এবং সুশাসনের বিষয়ে অধিক আগ্রহী। ডিজিটাল সচেতনতার কারণে প্রার্থীরা কেবল মাঠের প্রচারণায় নয়, বরং সোশ্যাল মিডিয়াতেও তীব্র ‘অগ্নিপরীক্ষার’ সম্মুখীন হচ্ছেন। ভোটের গতিপথ এখন চায়ের টেবিল থেকে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে উঠে এসেছে। রাজনৈতিক দলগুলো এখন উপলব্ধি করতে পেরেছে যে, পুরনো ধাঁচের রাজনীতি দিয়ে এই বিশাল তরুণ গোষ্ঠীকে আকর্ষণ করা সম্ভব নয়। তাই প্রতিটি দলের ইশতেহারে এখন প্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, জলবায়ু পরিবর্তন এবং শিক্ষা সংস্কারের মতো বিষয়গুলো প্রাধান্য পাচ্ছে। তরুণদের মনস্তত্ত্ব বুঝতে পারা এবং তাদের ভাষায় কথা বলতে পারা প্রার্থীরাই আগামীতে ক্ষমতার সমীকরণ নির্ধারণ করবেন।”
বিশাল এই তরুণ জনশক্তিকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর আগামীর রণকৌশল। পুরনো ধাঁচের রাজনীতি দিয়ে এই সচেতন প্রজন্মকে আকর্ষণ করা সম্ভব নয় বুঝতে পেরে দলগুলো তাদের ইশতেহারে ফ্রিল্যান্সিং, প্রযুক্তি-নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং কর্মসংস্থানের মতো আধুনিক বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এই সাড়ে চার কোটি ভোটার যদি ঐক্যবদ্ধভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন, তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচিত হবে।